Type to search

জাতীয় বাংলাদেশ

এল নিনোর প্রভাবে বর্ষায় ছন্দপতন, কম বৃষ্টি বেশি তাপমাত্রা

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব এবং প্রশান্ত মহাসাগরে এল নিনোর সক্রিয়তার কারণে চলতি বর্ষা মৌসুমের আবহাওয়ার স্বাভাবিকতায় ছন্দপতন ঘটেছে। এ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে জলবায়ু বিশেষজ্ঞদেরও। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) এবং সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক ফোরামের সর্বশেষ তথ্যমতে, চলতি বর্ষায় স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাত এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।

এরই মধ্যে বর্ষাকালের স্বাভাবিক ছন্দপতন ঘটতে শুরু করেছে। বছরের দ্বিতীয় বৃষ্টিবহুল মাস জুনে দেশে গড়ে ৪৫৯ মিলিমিটার বৃষ্টি হওয়ার কথা থাকলেও ৪৭ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছে। এক দশকের মধ্যে চলতি জুন মাসেই সবচেয়ে কম বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয় জুলাই মাসে—গড়ে ৫২৩ মিলিমিটার। চলতি বছর জুলাই মাসেও কম বৃষ্টির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

আবহাওয়াবিদ আফরোজা সুলতানা আমার দেশকে বলেন, বিগত এক দশকের মধ্যে এ ধরনের কম বৃষ্টিপাত আর কখনো লক্ষ্য করা যায়নি। এবার জুলাই মাসেও কম বৃষ্টি হতে পারে।

এ প্রসঙ্গে আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক আমার দেশকে বলেন, বর্তমানে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু এবার সময়মতো প্রবেশ করলেও সারা দেশে সেভাবে সক্রিয় হতে পারছে না। মাঝেমধ্যে বৃষ্টি হলেও তা উষ্ণ বৃষ্টি ঝরাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, বৃষ্টি হলেও এবার বর্ষায় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা থাকবে। এ ছাড়া, এবার এল নিনো সক্রিয় থাকায় সারা বিশ্বেই এর প্রভাব থাকবে। এতে বর্ষাকালে থেমে থেমে বৃষ্টি হলেও বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেড়ে তাপমাত্রার তুলনায় বেশি ভ্যাপসা গরম অনুভূত হতে পারে।

আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের পানির অস্বাভাবিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি, যা বিশ্বজুড়ে বায়ুমণ্ডলের স্বাভাবিক চলাচলে পরিবর্তন ঘটায়। বর্তমানে এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াটি জুন-আগস্ট মাসে শক্তিশালী হওয়ার ৮০ শতাংশ সম্ভাবনা রয়েছে। এর সরাসরি প্রভাবে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে মৌসুমি বায়ুর স্বাভাবিক গতিপথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যা দেশে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিচ্ছে।

কেন চিন্তার কারণ?

মৌসুমি বায়ু দুর্বল হয়ে পড়ায় জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে যে পরিমাণ বৃষ্টি হওয়ার কথা, তা না হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, এল নিনোর বছরে বাংলাদেশে বার্ষিক বৃষ্টিপাত গড়ে প্রায় ১৪৫ মিলিমিটার পর্যন্ত কম হতে পারে। বৃষ্টির অভাবে বাতাসে জলীয় বাষ্পের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, যার ফলে দেশের ওপর দিয়ে বর্ষাতেও তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। আকাশ মেঘমুক্ত থাকায় সূর্যের বিকিরণ সরাসরি ভূপৃষ্ঠকে উত্তপ্ত করছে, যা জনজীবনে অসহনীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে।

কৃষিখাতেও ধানের উৎপাদনে—বিশেষ করে আমন মৌসুমের চারা রোপণ ও বৃদ্ধির জন্য—বৃষ্টির পানির কোনো বিকল্প নেই। বৃষ্টির অভাব ও তাপপ্রবাহের কারণে মাটির আর্দ্রতা কমে যাচ্ছে, যা ফসলের জীবনকাল ও ফলনের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

এ পরিস্থিতির প্রভাব পড়বে জাতীয় অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্যের ওপর। দক্ষিণ এশীয় জলবায়ু ফোরামের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আসন্ন মাসগুলোতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়া এবং জলাধারগুলোতে পানির স্বল্পতার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সেচব্যবস্থা এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজনে পানি সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে। এ ছাড়া, অতিরিক্ত গরমের কারণে হিটস্ট্রোক, পানিবাহিত রোগ এবং শিশুদের মধ্যে স্বাস্থ্যঝুঁকি বৃদ্ধির সতর্কবার্তা দিয়েছেন চিকিৎসকেরা।

জলবায়ু বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এল নিনোর প্রভাবে এবারের বর্ষাকাল স্বাভাবিকের চেয়ে বেশ খানিকটা শুষ্ক ও উষ্ণ থাকতে পারে। এই পরিস্থিতিতে জরুরি ভিত্তিতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন তাঁরা। খরা-সহিষ্ণু ফসলের জাত ব্যবহার এবং বিকল্প সেচব্যবস্থার আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ, বৃষ্টির পানি ধরে রাখা এবং ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহারে মিতব্যয়ী হওয়া, তাপপ্রবাহের সময় সরাসরি রোদে বেশিক্ষণ কাজ না করা এবং শিশু ও বয়স্কদের স্বাস্থ্যের প্রতি বাড়তি নজর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘জরুরি জলবায়ু সতর্কতা’ হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছেন। বাংলাদেশে বর্ষার এই পরিবর্তিত রূপ কৃষি ও জীবনযাত্রার জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের অনুরোধ জানিয়েছেন পরিবেশবিদরা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় মানবিক মূল্য দিচ্ছে স্বাস্থ্য খাত, কিন্তু জাতীয় বাজেট ও জলবায়ু অর্থায়নে সেই বাস্তবতার প্রতিফলন এখনও পর্যাপ্ত নয়। এ অবস্থায় জলবায়ু-সহনশীল স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ১৪০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন তাঁরা।

অথচ গবেষণায় দেখা যায়, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের মোট বাজেটের মধ্যে জলবায়ু-সম্পর্কিত বরাদ্দ ২০২১-২২ অর্থবছরে ছিল ২ দশমিক ৭৪ শতাংশ। কিন্তু ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৯৭ শতাংশে। একই সময়ে জাতীয় জলবায়ু বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের অংশও প্রায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমে ১ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ার কথা বিবেচনায় নিলে বরাদ্দ বাড়ার কথা ছিল, কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি।

সম্প্রতি রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে সুইজারল্যান্ড দূতাবাসের গভর্ন্যান্স, জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশবিষয়ক সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার শিরিন সুলতানা লিরা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্ক এখন আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়; এটি বর্তমান বাস্তবতা। এ বিষয়ে প্রমাণভিত্তিক তথ্যকে কার্যকর নীতি ও বাস্তবায়ন কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।

তিনি বলেন, জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নের সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক জলবায়ু আলোচনায় বাংলাদেশের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে স্বাস্থ্য খাতের জন্য অধিক অর্থায়ন সংগ্রহ করা সম্ভব হয়।

সম্প্রতি এক সংলাপ অনুষ্ঠানে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের জন্য একগুচ্ছ সুপারিশ তুলে ধরেন অংশগ্রহণকারীরা। এর মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্য খাতের জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনার অগ্রাধিকারগুলো বাজেট প্রক্রিয়ায় আরও শক্তভাবে অন্তর্ভুক্ত করা, জলবায়ু বাজেট পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা উন্নত করা, রোগ নজরদারি ও জরুরি প্রস্তুতির জন্য নিয়মিত অর্থায়ন বৃদ্ধি করা এবং স্বাস্থ্য খাতের অভিযোজন কার্যক্রমের জন্য দেশীয় জলবায়ু তহবিলে অধিক প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা। -আমার দেশ

Translate »