Type to search

জাতীয় বাংলাদেশ

আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবসে বাংলাদেশের বাস্তবতা: গণতন্ত্র কতদূর, কোন পথে?

আজ ১৫ সেপ্টেম্বর, আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস। জাতিসংঘের উদ্যোগে ২০০৭ সাল থেকে দিনটি পালিত হয়ে আসছে গণতন্ত্রের অন্তর্নিহিত শক্তি ও মূল্যবোধকে সামনে রেখে। প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে—‘Achieving Gender Equality: Action by Action’, অর্থাৎ পদক্ষেপে পদক্ষেপে লিঙ্গ সমতা অর্জন। এ বার্তাটি কেবল একটি স্লোগান নয়, বরং গণতন্ত্রের মৌলিক শর্তেরই প্রতিধ্বনি। কারণ গণতন্ত্র কেবল ব্যালট বাক্সে সীমাবদ্ধ নয়, এটি মানুষের জীবনধারায় সমতা, মর্যাদা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই গণতন্ত্র দিবস কি উদ্‌যাপনের দিন, নাকি আত্মসমালোচনার দিন?

গণতন্ত্র: অর্জন না অনিশ্চয়তা?

বাংলাদেশের ইতিহাসে গণতন্ত্র শব্দটি একদিকে যেমন সংগ্রামের প্রতীক, অন্যদিকে এটি বারবার পদদলিত হয়েছে স্বৈরতন্ত্র, সামরিক শাসন এবং দমননীতির কারণে। জুলাই আন্দোলনে হাজারো মানুষ রক্ত দিয়েছে, প্রাণ দিয়েছে মুক্তির আশায়। অথচ আজকের বাস্তবতায় গণতন্ত্র যেন ক্রমশ আস্থাহীনতায় ভুগছে।

অন্তর্বর্তী সরকার আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা দিলেও জনমনে সংশয় ঘনীভূত। চারদিকে শোনা যাচ্ছে, অশুভ শক্তি নির্বাচন বানচালের চক্রান্তে লিপ্ত। এই আশঙ্কা গণতন্ত্রের শেকড়কে আরও দুর্বল করে তোলে। নির্বাচন যদি জনআস্থাহীন হয়ে পড়ে, তবে গণতন্ত্রের মূল ভিত্তিই ভেঙে পড়ে।

লিঙ্গ সমতার প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতা

জাতিসংঘের প্রতিপাদ্যে লিঙ্গ সমতা অর্জনের বিষয়টি অগ্রাধিকার পেয়েছে। সত্যিই কি আমরা এগোচ্ছি? বাংলাদেশে নারী রাজনীতিতে সক্রিয়, প্রশাসনে নেতৃত্ব দিচ্ছে, এমনকি প্রধানমন্ত্রীও একজন নারী। তবু তৃণমূল পর্যায়ে নারীরা এখনও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রান্তিক অবস্থানে। রাজনীতির মাঠে, বিশেষ করে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায়, নারীরা নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ে—সহিংসতা, সামাজিক চাপ, আর্থিক অসুবিধা এবং পুরুষতান্ত্রিক রাজনীতির দেয়ালে আটকে থাকে তাদের অংশগ্রহণ।

অন্যদিকে তৃতীয় লিঙ্গ ও লিঙ্গ বৈচিত্র্যের মানুষদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ কার্যত অদৃশ্য। গণতন্ত্রের আলো যদি সকল নাগরিকের ঘরে না পৌঁছায়, তবে সেটি কতটা প্রকৃত গণতন্ত্র?

ছাত্ররাজনীতি: গণতন্ত্রের পরীক্ষাগার নাকি হিংসার আখড়া?

ডাকসু, জাকসু নির্বাচনকে অনেকেই গণতন্ত্রের লিটমাস টেস্ট বলে মনে করেন। কারণ এখান থেকেই তৈরি হয় ভবিষ্যতের জাতীয় নেতৃত্ব। কিন্তু সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলো দেখাচ্ছে এক ভিন্ন চিত্র। ইসলামি শক্তি তাদের উপস্থিতি জানান দিয়েছে, বিএনপি অভিযোগ করছে ভোট কারচুপির, আবার কখনও বর্জনের পথে যাচ্ছে। ফলে ছাত্ররাজনীতির মাঠে আসল গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার বদলে শূন্যতা ও হতাশা বাড়ছে।

এই পরিস্থিতি কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যা নয়, বরং জাতির রাজনৈতিক ভবিষ্যতের সংকেত। ছাত্ররাজনীতি যদি কলুষিত হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ জাতীয় নেতৃত্বও কি কলুষিত হবে না?

ইসলামী শক্তির উত্থান: গণতন্ত্রের চ্যালেঞ্জ নাকি বিকল্প স্রোত?

সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামী শক্তির উত্থান আরেকটি নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। তাদের উপস্থিতি সংসদ থেকে ক্যাম্পাস পর্যন্ত বিস্তৃত। প্রশ্ন হচ্ছে—এটি কি গণতন্ত্রের জন্য হুমকি, নাকি গণতান্ত্রিক বহুত্ববাদের অংশ?

গণতন্ত্র মানে মত প্রকাশের স্বাধীনতা। ইসলামী শক্তিও সেই অধিকারের আওতায় সংগঠিত হতে পারে। কিন্তু যদি তারা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ব্যবহার করে গণতন্ত্র ধ্বংসের চেষ্টা করে, তবে সেটি বিপজ্জনক। ইতিহাসে আমরা বারবার দেখেছি—গণতন্ত্রের শত্রুরা অনেক সময় গণতন্ত্রের পোশাক পরে আসে।

নির্বাচন ও আস্থার সংকট

অর্ন্তবর্তী সরকারের হাতে আগামী নির্বাচনের আয়োজন। কিন্তু জনগণের আস্থা এখনও দুর্বল।

নির্বাচন যদি প্রতিযোগিতাহীন হয়, ভোটাররা যদি কেন্দ্রে না যায়, তাহলে নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাবে। আর একবার সেই প্রশ্ন উঠলেই গণতন্ত্রের মেরুদণ্ড ভেঙে পড়বে।

গণতন্ত্র: কতদূর, কোন পথে?

গণতন্ত্রের বর্তমান সংকট আসলে আস্থার সংকট। গণতন্ত্র মানে শুধু ভোট নয়, এটি হলো জবাবদিহি, স্বচ্ছতা, সমান সুযোগ ও মানবিক মর্যাদা। কিন্তু আজকের বাংলাদেশে দেখা যাচ্ছে—

নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা
ছাত্ররাজনীতিতে সৎ প্রতিযোগিতার অভাব
ইসলামী শক্তির অযাচিত উত্থান
নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণে প্রাতিষ্ঠানিক বাধা
জনগণের ভোটাধিকার নিয়ে সংশয়
এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস উদ্‌যাপন কি কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়?

গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে মানুষের আস্থায়। সেই আস্থা গড়ে ওঠে ন্যায়সঙ্গত নির্বাচন, সক্রিয় অংশগ্রহণ, লিঙ্গ সমতা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার মাধ্যমে। যদি এ মৌলিক উপাদানগুলো অনুপস্থিত থাকে, তবে গণতন্ত্র কেবল একটি নামমাত্র ধারণায় রূপ নেবে।

আজকের বাংলাদেশে প্রয়োজন একটি সৎ আত্মসমালোচনা, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সহনশীলতার চর্চা।

প্রখ্যাত রাষ্ট্রচিন্তক আব্রাহাম লিঙ্কনের বিখ্যাত বাণী আমাদের মনে রাখা উচিত:

“গণতন্ত্র হচ্ছে জনগণের সরকার, জনগণের দ্বারা পরিচালিত সরকার এবং জনগণের কল্যাণে পরিচালিত সরকার।” লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট

-দৈনিক মানবজমিন

Translate »