Type to search

জাতীয় বাংলাদেশ

ছোট ছোট ভূমিকম্প কি বড় ভূমিকম্পের আলামত?

দুই দিনে চার দফা ভূমিকম্প নিয়ে আতঙ্ক না কাটতেই ফের ভূপৃষ্ঠের ঝাঁকুনিতে কাপল বাংলাদেশ। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকাল ৪টা ১৫ মিনিটে এ ভূমিকম্প হয় বলে জানিয়েছেন আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূকম্পন পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের কর্মকর্তা রুবাঈয়্যাত্ কবীর। তিনি বলেন, ভূমিকম্পের উত্পত্তিস্থল ছিল ঢাকা থেকে ২৮ কিলোমিটার দূরে নরসিংদীর ঘোড়াশালে। এটি ছিল মৃদু মাত্রার ভূমিকম্প, রিখটার স্কেলে এটি ছিল ৩ দশমিক ৬ মাত্রার।

এর আগে বুধবার রাত সাড়ে ৩টার দিকে বাংলাদেশে দুটি ভূমিকম্প হওয়ার তথ্য দিয়েছে ইউরোপিয়ান মেডিটেরিয়ান সিসমোলজিক্যাল সেন্টার (ইএমসিএস)। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, রাত ৩টা ২৯ মিনিট ৫৫ সেকেন্ডে হওয়া চার মাত্রার ভূমিকম্পের উত্পত্তিস্থল ছিল কক্সবাজার থেকে ১৫০ কিলোমিটার দূরের বঙ্গোপসাগর। এক মিনিটের ব্যবধানে ৩টা ৩০ মিনিট ৪৯ সেকেন্ডে আরেকটি ভূমিকম্প হয়, যার উত্পত্তিস্থল ছিল সিলেট থেকে ২৪ কিলোমিটার উত্তরে। রিখটার স্কেলে এটি ছিল ৩ দশমিক ৪ মাত্রার। গত শুক্রবার সকালে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় ভূমিকম্প আঘাত হানে বাংলাদেশে। ঐ ভূমিকম্পে তিন জেলায় অন্তত ১০ জনের মৃত্যু হয় এবং ছয় শতাধিক মানুষ আহত হয়। বেশকিছু বাড়ি-ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়।  বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদি আহমেদ আনসারী সরকারকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, “এই ভূমিকম্পটা বলা যেতে পারে ‘ফোরশক’। বড় ভূমিকম্পের আগে ছোট ছোট যে ভূমিকম্প, এটা সেগুলোর একটি।” ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার মনে করেন, বড় ধরনের একটি ভূমিকম্পের বিপদ বাংলাদেশের সামনে অপেক্ষা করছে। ঐ ঝুঁকি বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছেছে জনগণের সচেতনতা, সরকারের পরিকল্পনা এবং প্রস্তুতির অভাবে। ভূমিকম্প ঠেকানো যাবে না, প্রতিরোধ করা সম্ভব না, আগাম সংকেতও দেওয়া যাবে না; কিন্তু এর ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা সম্ভব, যদি সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।

ভূমিকম্প নিয়ে জনমনে আতঙ্কের মধ্যে গত সোমবার বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে জরুরি বৈঠক ডাকেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। ঐ বৈঠক একটি টাস্কফোর্স গঠন করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের পাঠানো লিখিত সুপারিশ নিয়ে সরকার দ্রুত সময়ে আলোচনা করে টাস্কফোর্স গঠন করবে। ভূমিকম্পের বিষয়ে আশু করণীয় নিয়ে গঠিত টাস্কফোর্সে সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা যুক্ত থাকবেন। ঐদিন বৈঠকের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ কমিটি এবং এক বা একাধিক টাস্কফোর্স গঠনের বিষয়ে কাজ চলছে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ পাওয়া মাত্রই সে অনুযায়ী কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে।

গত শুক্রবার রিখটার স্কেলে ৫.৭ মাত্রার এই ভূমিকম্পের উত্পত্তিস্থল ছিল ঢাকা থেকে মাত্র ১৩ কিলোমিটার দূরে নরসিংদীর মাধবদীতে এবং এর কেন্দ্র ছিল ভূপৃষ্ঠের ১০ কিলোমিটার গভীরে। পরদিন শনিবার সকালে নরসিংদীর পলাশে ৩.৩ মাত্রার ভূমকম্পি হয়। তার রেশ না কাটতেই সন্ধ্যায় সেকেন্ডের ব্যবধানে দুটি ভূমিকম্প হয়, যার একটি উত্পত্তিস্থল ঢাকার বাড্ডা, আরেকটি সেই নরসিংদীতেই। বৃহস্পতিবারের ভূমিকম্পের উত্পত্তিস্থলও নরসিংদী।

বহু বছর ধরেই দেশে ভূমিকম্পের বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের সতর্কতার বিপরীতে সরকারিভাবে ‘নানা উদ্যোগের’ কথা বলা হচ্ছিল। এর মধ্যে গত শুক্রবার যে ভূমিকম্প হয়েছে, তার তীব্র ঝাঁকুনিতে ভবন থেকে নামতে গিয়ে কিংবা লাফিয়ে পড়ে আহত হয়েছে অন্তত ছয় শতাধিক মানুষ। যাদের মধ্যে বেশ কয়েক জন ‘গুরুতর’ অবস্থায় এখনো চিকিত্সাধীন। এমন প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিষয়ে কোনো ধরনের প্রস্তুতি ‘না থাকার’ পাশাপাশি সামনে এসেছে প্রায় সব শ্রেণির মানুষের ‘সচেতনতার ঘাটতি’র বিষয়টি। পাশাপাশি শনিবারের তিন দফা ‘মৃদু ও হালকা’ ভূমিকম্পের উত্পস্থিল নিয়ে ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্রের ‘ভুল বার্তা’র পর তাদের সক্ষমতা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।

-দৈনিক ইত্তেফাক

Translate »