Type to search

আন্তর্জাতিক

ভারতে যৌতুকে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়লেও নীরব প্রশাসন, বাড়ছে উদ্বেগ

ভারতে প্রতি বছর হাজারো নারী যৌতুক-সংক্রান্ত নির্যাতন ও হত্যার শিকার হলেও এসব ঘটনা এখন আর আগের মতো জনমনে ক্ষোভ সৃষ্টি করছে না বা রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে না। নতুন এক গবেষণায় এমন উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।

গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৯৬১ সালে ভারতে যৌতুক প্রথা আইন করে নিষিদ্ধ করা হলেও বাস্তবে তা এখনও ব্যাপকভাবে প্রচলিত। বিয়ের পর কনের পরিবার যৌতুকের দাবি পূরণ করতে না পারলে অনেক নারী শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। অনেক ক্ষেত্রে তাদের হত্যা করা হয় অথবা আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়।

গবেষণা অনুযায়ী, ২০২২ সালে ভারতে যৌতুক-সংক্রান্ত মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৬ হাজার ৫১৬। অথচ ১৯৮৮ সালে এই সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৮৪১। অর্থাৎ সময়ের সঙ্গে এ ধরনের মৃত্যুর সংখ্যা কমার বদলে বেড়েছে।

গত বছরের আগস্টে দিল্লির উপকণ্ঠ গ্রেটার নয়ডার ২৮ বছর বয়সি নিকি ভাটিকে যৌতুকের বিরোধের জেরে তার স্বামী ছয় বছরের ছেলের সামনেই আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করেন। হত্যার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর কিছু সময়ের জন্য ক্ষোভ ও বিক্ষোভ দেখা দিলেও দ্রুতই সেই প্রতিক্রিয়া স্তিমিত হয়ে যায়।

লন্ডনের কিংস কলেজের কিংস ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউটের সামাজিক নৃবিজ্ঞানী ও গবেষণাটির লেখক ড. কৃতি কাপিলা বলেন, বর্তমানে ভারতসহ বিশ্বের অনেক দেশে প্রতিবাদ ও ভিন্নমত প্রকাশের পরিসর সংকুচিত হয়েছে। ফলে সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে আগের মতো সংগঠিত আন্দোলন গড়ে ওঠা কঠিন হয়ে পড়েছে।

গবেষণায় আরও বলা হয়, অতীতে যৌতুক ছিল বরপক্ষকে দেওয়া একটি সামাজিক উপহার। কিন্তু আইন করে নিষিদ্ধ হওয়ার পর এটি ধীরে ধীরে আর্থিক দাবিতে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে বরের শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশা, সামাজিক মর্যাদা ও জাতপাতের ভিত্তিতে যৌতুকের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়। দাবি পূরণ না হলে নববধূকে নির্যাতনের ঘটনা ঘটে।

১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে যৌতুকজনিত সহিংসতার বিরুদ্ধে ভারতে শক্তিশালী নারী আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। সে সময় অনেক নববধূকে রান্নাঘরের তথাকথিত ‘দুর্ঘটনায়’ কেরোসিন ঢেলে পুড়িয়ে হত্যা করা হতো, যা জনরোষের জন্ম দিয়েছিল।

তবে ১৯৯০-এর দশকের পর কেরোসিনের ব্যবহার কমে যাওয়ায় হত্যার ধরনও বদলে যায়। গবেষণায় বলা হয়েছে, বর্তমানে অনেক নারীকে এমনভাবে নির্যাতন করা হয় যে তারা আত্মহত্যা করতে বাধ্য হন। এতে ঘটনাগুলো জনসমক্ষে প্রতিবাদের বদলে পারিবারিক ট্র্যাজেডি হিসেবে দেখা হয়, ফলে জনআন্দোলনও দুর্বল হয়ে পড়েছে।

গবেষণায় কন্যাভ্রূণ হত্যার প্রবণতাও যৌতুক সমস্যার সঙ্গে যুক্ত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে যৌতুকের আর্থিক চাপ এড়াতে অনেক পরিবার কন্যাসন্তান জন্ম নেওয়ার আগেই গর্ভপাতের পথ বেছে নেয়। এর ফলে ভারতের জনসংখ্যায় নারী-পুরুষের ভারসাম্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

ড. কাপিলার মতে, যৌতুকজনিত সহিংসতা এখনও অসংখ্য নারীর প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। কিন্তু এসব মৃত্যু আর সমাজ বা রাজনীতিতে আগের মতো আলোড়ন সৃষ্টি করছে না, যা গভীর উদ্বেগের বিষয়।

সূত্র: গার্ডিয়ান

Translate »