বেড়েছে নারী নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা, নারীবিদ্বেষী মনোভাব
ভোলার তজুমদ্দিন উপজেলার কামারপট্টি এলাকায় চাঁদা না পেয়ে স্বামীকে বেঁধে মারধর ও স্ত্রীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ পাওয়া যায় চলতি বছর ৩০ জুন। এ ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে। ১৯ মার্চ রাজধানীর মিরপুরে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এক নারী। পল্লবী থানার বালুরঘাট এলাকার একটি নির্মাণাধীন ভবনে তাকে রাতভর আটকে রেখে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করা হয়। এ ঘটনায় পল্লবী থানায় একটি মামলা হয়। প্রতিদিনই এমন ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের প্রতিবেদন অনুযায়ী চলতি বছর জানুয়ারি থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত মোট ৫২৮ জন নারী ও কন্যা শিশু নানা কারণে নানাভাবে ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এই হিসাবমতে প্রতিদিন দুই জনেরও বেশি নারী ও কন্যা শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এমন বাস্তবতার মধ্যে আজ ২৪ আগস্ট দেশ জুড়ে পালিত হচ্ছে ‘ইয়াসমিন হত্যা দিবস’ বা নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস। ৩০ বছর আগে, ১৯৯৫ সালের এই দিনে দিনাজপুরে কিশোরী ইয়াসমিনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। ঘটনায় জড়িত ছিল কয়েক জন পুলিশ সদস্য। ঘটনার প্রতিবাদে দিনাজপুরে আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ে সাধারণ জনগণ। বিক্ষুব্ধ জনতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে নির্বিচারে গুলি চালায় পুলিশ। নিহত হন সাত জন। তারপর থেকে দিনাজপুরে দিনটি ‘ইয়াসমিন হত্যা দিবস’ হিসেবে পালন করা হলেও সারা দেশে ‘নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবেও পালন করা হয়।
মহিলা পরিষদের প্রতিবেদনমতে, ২০২৫ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত ধর্ষণের শিকার হয় ৩৫৪ জন। ১০৬ জন নারী ও কন্যা দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়। ২০২৪ সালের একই প্রতিবেদনে দেখা যায়, উক্ত সময় ধর্ষণের শিকার হয় ৩৫৪ জন, দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয় ১৪৪ জন। এ সময় মোট ধর্ষণের শিকার হয় ৪৯৮ জন। গত বছরের তুলনায় এ বছর সাত মাসে ধর্ষণ বেড়েছে ১২ শতাংশের বেশি।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, ইয়াসমিন হত্যার ৩০ বছর পর ধর্ষণ কমেনি, কমেনি কোনো রকম নারী নির্যাতন, বরং আরও নিষ্ঠুর আকার ধারণ করেছে, কন্যা শিশু ধর্ষণ বেড়েছে। ভয়াবহতা বেড়েছে। তিনি বলেন, ধর্ষণ বন্ধ করতে রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রের যে কর্মকাণ্ড প্রয়োজন সে বিষয়গুলো দেখা যাচ্ছে না। বর্তমান সময় নারী নির্যাতনের সঙ্গে সঙ্গে নারী বিদ্বেষী মনোভাবের প্রকাশ ও প্রচার বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, রাষ্ট্রের সক্রিয় পদক্ষেপ গ্রহণ ও রাজনৈতিক দলের সদিচ্ছা ছাড়া নারী আন্দোলন নারী নির্যাতন বন্ধ করতে পারবে না।
ঘরেই বেশি নির্যাতনের শিকার হয় নারী :আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত স্বামীর হাতে হত্যার শিকার হয় ১৩৩ জন নারী। স্বামীর পরিবারের সদস্যদের হাতে হত্যার শিকার হয়েছেন ৪২ জন। আর নিজ পরিবারের সদস্যদের হাতে হত্যার শিকার হন ৩৩ জন। এ সময় পারিবারিক নির্যাতনের কারণে ২০৮ জন নারী ও কন্যা শিশু হত্যার শিকার হয়। পারিবারিক নির্যাতনে মৃত্যু ঘটে ৩২২ জন নারীর। প্রতিদিন একজন নারী হত্যার শিকার হয়। এ সময় ৩৬৩টি পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও আসকের চেয়ারপার্সন জেড আই খান পান্না বলেন, স্বামীর হাতে কখনোই নারীরা নিরাপদ ছিল না। এটা এখন প্রচার হচ্ছে, আগে এতটা প্রচার হতো না। তিনি বলেন, পুরুষশাসিত সমাজ বলেই নারীকে একটা চড়-থাপ্পড় দেওয়াটা অপরাধ হিসেবে গণ্য হয় না। এই অবস্থা পরিবর্তনে নারীকে শারীরিকভাবে ও অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল হওয়ার উপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
জাতীয় হেল্প লাইনেও নারী নির্যাতনের ফোন কল বেশি :জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ‘৯৯৯’-এর তথ্য অনুসারে, চলতি বছর সাড়ে আট মাসে স্বামীর বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ এসেছে ৯ হাজার ৩৯৪টি। নারী নির্যাতনের ঘটনায় মোট কল আসে ১৭ হাজার ৩৪১টি। এর মধ্যে পারিবারিক নির্যাতনের অভিযোগে কল করে ৯ হাজার ৭৪৬ জন। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের হেল্পলাইন ‘১০৯’-এর তথ্য অনুসারে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে শারীরিক-মানসিক নির্যাতনের শিকার নারীর জন্য সহায়তা চেয়ে কল এসেছে ৪৮ হাজার ৭৪৫টি।
আইন ও নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে :২০২৪-এ এক বছর সময়কালে মোট ২ হাজার ৫২৫ জন নারী ও কন্যা নির্যাতনের শিকার হয়েছে বলে মহিলা পরিষদ প্রতিবেদনে প্রকাশ পায়। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৩৬৭ জন কন্যাসহ ৫১৬ জন। তার মধ্যে ৮৬ জন কন্যাসহ ১৪২ জন দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ১৮ জন কন্যাসহ ২৩ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। ৫ জন কন্যাসহ ৬ জন ধর্ষণের কারণে আত্মহত্যা করেছেন। নারী নির্যাতন রোধে রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও পারিবারিক দায়িত্বের কথা বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সমাজবিজ্ঞানী ড. তৌহদুল ইসলাম।
-দৈনিক ইত্তেফাক

