Type to search

জাতীয় বাংলাদেশ

বিদ্যুৎ সরবরাহে শহর-গ্রামের মধ্যে প্রকট বৈষম্য

বিদ্যুৎ সরবরাহে দেশে শহর ও গ্রামের মধ্যে চরম বৈষম্য বিরাজ করছে। সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ ঘাটতির দিনেও স্বস্তিতে ছিলেন রাজধানীবাসী। তবে গ্রামীণ মানুষের জীবনে বিরাজ করে নাভিশ্বাস অবস্থা। কোথাও কোথাও দিনের বেশিরভাগ সময়ই বিদ্যুৎ থাকে না।

গত রোববার ঢাকায় কোনো লোডশেডিং ছিল না। যদিও এদিন দেশে সর্বোচ্চ ৩২৮০ মেগাওয়াট লোডশেডিং রেকর্ড করে বিদ্যুৎ বিভাগ। বিদ্যুতের ভেলকিবাজিতে অতিষ্ঠ মানুষ কয়েকটি জেলায় সড়ক ও মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে। বিদ্যুৎ অফিসে হামলা-ভাংচুরের ঘটনাও ঘটেছে।

পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলেও দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেন তিনি।

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্যমতে, রোববার মধ্যরাতে সারা দেশে বিদ্যুতের মোট চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ২৭৮ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে ১৩ হাজার ৯৯৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে সক্ষম হয় বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে ওই সময় সারা দেশে ৩২৮০ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়। তবে ঢাকা মহানগরীতে কোনো লোডশেডিং হয়নি। ঢাকা ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো) চাহিদার ১২৮৪ মেগাওয়াট এবং ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি) চাহিদার ১৮২১ মেগাওয়াটের পুরোটাই সরবরাহ করে।

তবে ঢাকা মহানগরীর বাইরে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) চাহিদার ২৮৬৪ মেগাওয়াটের মধ্যে ২৩৯৮ মেগাওয়াট সরবরাহ করতে সক্ষম হয়। ঢাকার আশপাশের পল্লী এলাকাগুলোতে এদিন ৪৬৬ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়। প্রায় একই অবস্থা দেশের বিভাগীয় শহর ও বিভাগগুলোর পল্লী এলাকাগুলোতেও।

বিদ্যুৎ বিভাগের রেকর্ড অনুযায়ী চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, সিলেট, খুলনা, বরিশাল ও রংপুরে বিদ্যুতের চাহিদা, সরবরাহ ও লোডশেডিং পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ওইসব শহরে লোডশেডিং হয়েছে পল্লী এলাকার তুলনায় অনেক কম। বিভাগীয় শহরগুলোতে লোডশেডিং হলেও তা ছিল সহনীয় পর্যায়ে। অপরদিকে সারা দেশে আরইবির অধীন এলাকাগুলোর বাসিন্দারা বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে চরম ভোগান্তিতে রয়েছেন।

বিদ্যুতের দাবিতে বিভিন্ন জেলায় গত কয়েকদিন ধরে গ্রাহকরা সড়ক ও মহাসড়ক অবরোধ করেছেন। গত রোববার দিবাগত রাতে কয়েকশ বিক্ষুব্ধ গ্রাহক জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলা সদরের পূর্বপাড়া এলাকার বিদ্যুৎকেন্দ্র ঘেরাও করেন। তারা সাংবাদিকদের জানান, পুরো উপজেলায় ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট চলছে। আসন্ন এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের পড়াশোনাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এ কারণেই তারা বিদ্যুৎকেন্দ্র ঘেরাও কর্মসূচি পালন করেছেন।

পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি মাদারগঞ্জ জোনাল অফিসের কর্মকর্তা জানান, উপজেলায় বিদ্যুতের চাহিদা ১৭-১৮ মেগাওয়াট। বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র সাত মেগাওয়াট। এ অবস্থায় চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে না। ফলে সময়-অসময়ে লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।

অলস পড়ে আছে বিদ্যুৎকেন্দ্র

বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, দেশে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার ৬৫ ভাগ কেন্দ্র অলস পড়ে আছে। প্রায় ৩০ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার বিপরীতে এখন জাতীয় সঞ্চালন লাইনে (ন্যাশনাল গ্রিডে) প্রতিদিন যোগ হচ্ছে মাত্র সাড়ে ১৪ হাজার মেগাওয়াটের মতো। এর মধ্যে দুই হাজার মেগাওয়াটের বেশি ভারত ও নেপাল থেকে আমদানি করা।

উৎপাদনে না থাকা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কোনো কোনোটি বসিয়ে রেখে সরকারকে ক্যাপাসিটি চার্জসহ বিদেশি ঋণের মোটা অঙ্কের সুদের টাকা গুনতে হচ্ছে। কর্মকর্তারা জানান, এক অর্থবছরেই পিডিবিকে ক্যাপাসিটি পেমেন্ট হিসেবে ২৬ হাজার কোটি টাকার বেশি পরিশোধ করতে হয়েছে। জ্বালানি সংকট ও বিদ্যুৎ নিয়ে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ভুল নীতিকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং এ খাতের বিশেষজ্ঞরা।

কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা ১২ হাজার মেগাওয়াট হলেও উৎপাদন হচ্ছে মাত্র পাঁচ হাজার মেগাওয়াট। এ খাতের প্রায় সাত হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রাখতে হচ্ছে গ্যাসের অভাবে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা সাড়ে সাত হাজার হলেও উৎপাদন হচ্ছে সাড়ে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট। কয়লার জোগানের অভাবে এ খাতের প্রায় দুই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যোগ হচ্ছে না। আর তেলভিত্তিক ৬২টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা সাড়ে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট। তবে বর্তমানে এসব কেন্দ্র থেকে ১২শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। সংকট মোকাবিলায় তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে আরো বেশি পরিমাণ বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার বিষয়ে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা।

বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলেন, জ্বালানি সংকটসহ নানান কারণে বর্তমানে প্রায় ১৮ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। ৩০ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎ কেন্দ্র থাকা সত্ত্বেও সরকারকে বর্তমানে ১৪-১৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। রাজনৈতিক কারণে দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য জ্বালানির যোগানের ব্যবস্থা না করে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির জন্য অসম চুক্তি করে গেছে পতিত আওয়ামী লীগ সরকার। এগুলো সবই দেশবাসীর জন্য গলার কাঁটা। গত ১৮ বছর দেশে নতুন করে গ্যাস কূপ অনুসন্ধান বন্ধ করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে মূলত আমদানিনির্ভর করে তোলা হয়েছে বলেও অভিযোগ বিশেষজ্ঞদের।

সরকারের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিগত সরকার যে লুটপাটের রাজত্ব কায়েম করে গেছে, তার দায় এখন এ সরকারের ওপর পড়েছে।

পরিস্থিতি উত্তরণের চেষ্টা সরকারের

বিদ্যুৎ সরবরাহ ও লোডশেডিং নিয়ে গতকাল সোমবার জাতীয় সংসদে ৩০০ বিধিতে দেওয়া বিবৃতিতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, ‘দেশে এখন বিদ্যুতের চাহিদা ১৪ হাজার ৮৩৯ মেগাওয়াট হলেও উৎপাদন হয়েছে ১৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট। কিছু কিছু জায়গায় লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। এটাও যাতে না থাকে, সেজন্য সচেষ্ট আছি। গতকালকে (রোববার) খারাপ ছিল, আজকে (সোমবার) সেখান থেকে উত্তরণ করতে পেরেছি।’

এর আগে রোববার একই বিধিতে দেওয়া বক্তব্যে মন্ত্রী জানিয়েছিলেন, কারিগরি ত্রুটির কারণে দেশের দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন থেকে বেরিয়ে গেছে। তাই বিভিন্ন জায়গায় লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। -আমার দেশ

Translate »