Type to search

অর্থ ও বাণিজ্য বাংলাদেশ

১০ আমদানিকারকের কাছে জিম্মি ৮৩ লাখ পরিবার

লিকুইফায়েড পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ব্যবহারকারী দেশের ৮৩ লাখ পরিবার জিম্মি হয়ে আছে মাত্র ১০ আমদানিকারকের কাছে। এর মধ্যে মাত্র চারটি কোম্পানি নিয়ন্ত্রণ করছে এলপিজি বাজারের ৬৮ শতাংশ। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) প্রতি মাসে অত্যাবশ্যকীয় এ পণ্যটির সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণ করে দিলেও মানছেন না ব্যবসায়ীরা।

সরকারি নির্দেশনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে গত দুই মাসে অন্তত ছয় কোটি ৬৪ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে অসাধু চক্রটি। তাদের চাপের মুখে এলপিজির দাম গত ছয় মাসে ৩৫ শতাংশ বাড়িয়েও স্বস্তিতে নেই সরকার। জিম্মিদশা থেকে মুক্তি পেতে আবারও দাম বাড়াতে যাচ্ছে সরকার। আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের চাপের মুখে আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর বিয়াম মিলনায়তনে গণশুনানি করবে বিইআরসি।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্যানুযায়ী, দেশে এলপিজির গ্রাহক এক কোটির বেশি। এর মধ্যে ৮৩ লাখ গ্রাহক পারিবারিক রান্নার কাজে এলপি গ্যাস ব্যবহার করেন। এসব পরিবার প্রতি মাসে অন্তত এক লাখ ২০ হাজার টন গ্যাস জ্বালায়। গত ৪ অক্টোবর ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করা হলেও দেশের কোথাও এই দামে গ্যাস মিলছে না। সাধারণ ভোক্তারা একেকটি সিলিন্ডার ২২০০-২৩০০ টাকায় কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। নাগরিকদের অন্যতম মৌলিক চাহিদা সরকারি লাইনের গ্যাস ঘোষণা দিয়ে সম্প্রসারণ বন্ধ রাখায় এসব পরিবার বাধ্য হয়ে বাড়তি খরচে এলপিজি ব্যবহার করছেন। কিন্তু বাড়তি দামেও গ্যাস না পাওয়ায় তাদের মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হচ্ছে।

জানা যায়, ২০২১ সালের আগে ব্যবসায়ীরা ইচ্ছামতো দামে এলপিজি বিক্রি করতেন। ওই বছর আদালতের আদেশে দাম নির্ধারণের ক্ষমতা পায় বিইআরসি। কিন্তু ব্যবসায়ীদের চাপের মুখে এবং ক্ষেত্রবিশেষে অনৈতিক লেনদেন ও যোগসাজশের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি আশপাশের দেশগুলোর চেয়ে বাড়তি দাম নির্ধারণ করে দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

আবার প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণে বাড়তি দামও কার্যকর করতে পারে না। যে কারণে এলপিজির দাম বাংলাদেশে বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ। দেশে প্রতি কেজির দাম ১৫৩ টাকা নির্ধারণ করা হলেও ভারতে পণ্যটির ভর্তুকিমূল্য বাংলাদেশি মুদ্রায় ৮৭ টাকা। ভর্তুকি ছাড়া মূল্য দাঁড়ায় ১০৮ টাকা। এছাড়া পাকিস্তানে ১২৪.১৬, নেপালে ১১৫.৩৫ এবং শ্রীলঙ্কায় প্রতি কেজি এলপিজির দাম ১১৬ টাকা। বাংলাদেশে নির্ধারিত দামের চেয়েও বেশি দামে বিক্রি করছে অসাধু চক্র।

৩০০ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব

প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাড়তি দাম নির্ধারণ এবং তার চেয়েও অধিক দামে এলপিজি বিক্রির পরও সরকারের ওপর জ্বালানিটির দাম বাড়াতে চাপ অব্যাহত রাখেন আমদানিকারক ও সরবরাহকারীরা। গত ১৮ অক্টোবর এলপিজি অপারেটর্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) পক্ষ থেকে বিইআরসি চেয়ারম্যানকে দাম সমন্বয়ের অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দেন সমিতির সাধারণ সম্পাদক আহসানুল জব্বার।

একই দাবি জানিয়ে ১৩ অক্টোবর চিঠি দেন ওমেরা পেট্টোলিয়ামের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) তানজিম চৌধুরী। দাম সমন্বয়ের জন্য প্রায় একই ভাষায় ১৫ অক্টোবর বিইআরসিকে পৃথক চিঠি দেন মেঘনা-ফ্রেশ এলপিজি লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার সালেহ আহমেদ এবং পেট্টোম্যাক্স এলপিজির পরিচালক আমিনুল ইসলাম। এসব চিঠিতে ব্যয় বৃদ্ধির ফিরিস্তি টেনে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ২৬৬-৩০০ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব করেন তারা। আর সরকারি প্রতিষ্ঠান এলপি গ্যাস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইউসুফ হোসেন ভূঁইয়া ৮২৫ টাকা সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের সাড়ে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১২৩৫ টাকা নির্ধারণের আবেদন জানিয়ে রেখেছেন গত ৮ ফেব্রুয়ারি।

সংকটের মূলে সিলিন্ডারের অভাব

আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দাম বৃদ্ধি, জাহাজ ভাড়া ও অন্যান্য ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং কিছু কোম্পানির আমদানি বন্ধ থাকায় এলপিজির বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে জানিয়ে ব্যবসায়ীরা বলছেন, আগস্টে দেশে এক লাখ ৫৮ হাজার টন এবং সেপ্টেম্বরে এক লাখ ৫৬ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। তবে আমদানি অব্যাহত থাকলেও বাজারে সব জায়গায় নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

সিলিন্ডারের অভাবকে সংকটের প্রধান কারণ উল্লেখ করে তারা জানান, দেশে বিভিন্ন কোম্পানির প্রায় পাঁচ কোটি ৩০ লাখ সিলিন্ডার থাকলেও বর্তমানে সক্রিয় রয়েছে মাত্র ১০টি কোম্পানির তিন কোটি সাত লাখ সিলিন্ডার। অধিকাংশ কোম্পানি আমদানি বন্ধ রাখায় বিপুলসংখ্যক সিলিন্ডার নিয়মিত সরবরাহ ব্যবস্থার বাইরে রয়েছে। এছাড়া ব্যাংক থেকে ঋণপত্র (এলসি) খোলার জটিলতা এবং আর্থিক দায়ের কারণে অনেক কোম্পানি আমদানি করতে পারছে না বলে জানান তারা।

সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গ্রাহকের কাছে একটি এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহ নিশ্চিত করতে চারটি সিলিন্ডার লাগে। এটি সরবরাহ চেইন ধরে রাখে। রান্নার গ্যাসে মাসে এখন সরবরাহ করা হচ্ছে অন্তত এক লাখ ২০ হাজার টন এলপিজি। এজন্য প্রয়োজন অন্তত তিন কোটি ৩২ লাখ সিলিন্ডার। আরো অন্তত ৬০ লাখ সিলিন্ডারের উপস্থিতি নিশ্চিত করা গেলে সরবরাহজনিত সংকট অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন ব্যবসায়ীরা।

বেসরকারি উদ্যোক্তাদের দখলে বাজার

বিইআরসির তথ্যানুযায়ী, দেশে ২৯টি এলপিজি কোম্পানি চালু থাকলেও সেপ্টেম্বরে আমদানি করেছে মাত্র ১০টি কোম্পানি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি এলপিজি আমদানি করেছে ইউনাইটেড আইগ্যাস।

দেশে প্রতি বছর অন্তত দেড় লাখ টন এলপিজি ব্যবহৃত হয়। এর ৮০ শতাংশ রান্নার কাজে, ১২ শতাংশ শিল্পে এবং আট শতাংশ ব্যবহৃত হয় গাড়ির জ্বালানি অটোগ্যাস হিসেবে। এলপিজির ৯৮.৬৬ ভাগ বাজার বেসরকারি উদ্যোক্তাদের দখলে। মাত্র চারটি কোম্পানি দেশের মোট এলপিজি বাজারের ৬৮ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। কোম্পানিগুলো হলোÑ ওমেরা, পেট্রোম্যাক্স, মেঘনা ও যমুনা। এছাড়া বিএম এনার্জি আট শতাংশ, ইউনাইটেড আইগ্যাস সাত শতাংশ, ডেল্টা চার শতাংশ, জেএমআই ও প্রিমিয়াম এলপিজি তিন শতাংশ করে বাজার দখলে রেখেছে। পুরো বাজার হাতে গোনা কয়েকটি কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে থাকায় তাদের পক্ষে বাজারের ওপর যে কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব বিস্তার করা সম্ভব হচ্ছে বলে জানান বিশ্লেষকরা।

সরকারি প্রতিষ্ঠানের অক্ষমতা

বাজার নিয়ন্ত্রণে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি বিপিসির আওতাধীন এলপিজি গ্যাস লিমিটেড নামে একটি কোম্পানিও আছে। যদিও কোম্পানিটির বাজারহিস্যা দেশের মোট চাহিদার ২ শতাংশের কম। এর প্রধান কারণ কোম্পানিটির তেমন কোনো মজুত ক্ষমতা নেই। আশার দিক হলো, সমস্যা সমাধানে সরকার নতুন করে কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। বাগেরহাটের মোংলায় ৬.৩৭ একর জমিতে ৮২০০ টন এলপিজি মজুতের ট্যাংক তৈরির প্রস্তুতি চলছে। টাঙ্গাইলের কালিহাতী ও রাজাবাড়ীতে ৬.৯১ একর এলাকায় মজুত ও বটলিং প্ল্যান্ট স্থাপন করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। শুনানিতে এলপিজি গ্যাস লিমিটেডের গ্যাসের দামও বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে সরকারি এ সংস্থা। সাড়ে ১২ কেজি সরকারি গ্যাসের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য মাত্র ৮২৫ টাকা, যেখানে ১২ কেজি বেসরকারি গ্যাসের খুচরা মূল্য ১৮৩৭ টাকা।

ভয়াবহ গোয়েন্দা তথ্য

এলপি গ্যাস নিয়ে চলমান কারসাজির সঙ্গে কিছু বড় কোম্পানি জড়িত থাকতে পারে জানিয়ে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সরবরাহ আটকে রাখার মাধ্যমে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করা হতে পারে। প্রতিবেদনে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের নাম উঠে আসে সন্দেহের তালিকায়। প্রতিষ্ঠানগুলো হলোÑ আইগ্যাস, পেট্রোম্যাক্স, বিএম এনার্জি, ওমেরা ও যমুনা।

গোয়েন্দাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এলপিজির আমদানি, মজুত ও বাজারে সরবরাহের পুরো প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। যদিও অভিযোগে উঠেছে, ধর্মঘটের হুমকি দানের মাধ্যমেই তারা সব উদ্যোগ থামিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে । ব্যবসায়ীদের চাপেই গণশুনানি আয়োজন করতে বাধ্য হয়েছে সরকার।

লুণ্ঠনের বাজারে ভোক্তারা জিম্মি: ক্যাব

বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কোনো উদ্যোগ না নিয়ে এলপিজির দাম বাড়ানোর উদ্যোগে ক্ষোভ প্রকাশ করে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, কয়েকটি কোম্পানি মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে। তারা এক মাসেই শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এখন আবার শুনানি করে দাম বাড়ানো হচ্ছে।

লুণ্ঠনের বাজারে ভোক্তারা জিম্মিÑ মন্তব্য করে তিনি বলেন, বিইআরসি এক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয় হয়ে আছে। তার দাবি, বিচার বিভাগীয় তদন্ত করে মজুতে জড়িতদের বের করে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে, প্রয়োজনে লাইসেন্স বাতিল করতে হবে।

নীতির ভুলে বাজার অনিয়ন্ত্রিত: লোয়াব

গ্রাহকদের জিম্মি করে বাড়তি অর্থ আদায়ের অভিযোগ অস্বীকার করে লোয়াব সাধারণ সম্পাদক আহসানুল জব্বার বলেন, খুচরা মূল্য নির্ধারণে বিইআরসির ভুল নীতির কারণে বাজারের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা যাচ্ছে না। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, বিইআরসি পূর্ববর্তী মাসের এভারেজ সেটেলমেন্ট রেট নিয়ে চলতি মাসের মূল্য নির্ধারণ করে। এছাড়া আমদানি থেকে বিক্রেতার হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি স্তরেই নির্ধারিত বরাদ্দের চেয়ে প্রকৃত খরচ অনেক বেশি।

তিনি বলেন, এলপিজি অপারেটর, ডিস্ট্রিবিউটর ও রিটেইলাররা বিইআরসি ঘোষিত মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। কিন্তু ঘোষিত মূল্য সময়োপযোগী না হওয়ায় অনেক সময় সম্পূর্ণ রূপে পালন করা সম্ভব হয় না। এলপিজি শিল্পের বিকাশ এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের সুবিধাবঞ্চিত প্রত্যেক গ্রাহকের কাছে এলপিজি পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে বিইআরসি যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ করে দেবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন লোয়াব সাধারণ সম্পাদক।

শুনানি মানেই দাম বাড়ানো নয়: বিইআরসি

আমদানি স্বাভাবিক আছে দাবি করে বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, আমদানি কমেনি বলেই সরবরাহে সংকট হওয়ার কথা নয়। তারপরও যেসব কোম্পানি আমদানি করতে পারছে না, তাদের ঋণপত্র খোলার জটিলতা কমানোর বিষয়ে বিইআরসির পক্ষ থেকে জ্বালানি বিভাগকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। জ্বালানি বিভাগ ইতিমধ্যে উদ্যোগ নেওয়ায় পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে।

পরিস্থিতির আরো উন্নতি হবে আশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, গণশুনানির আয়োজন করার অর্থ এই নয় যে, এলপিজির দাম বাড়বে। আমরা সব পক্ষের বক্তব্য শুনব, কাগজপত্র দেখব এবং তার ভিত্তিতে দাম সমন্বয় করব। তাতে দাম বাড়তেও পারে, কমতেও পারে।

সিলিন্ডার কেনার বিষয়েও শুনানিতে বিস্তারিত আলোচনা হবে বলে জানান তিনি। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী বিইআরসি, প্রতিযোগিতা কমিশন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও বিএসটিআইসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সক্রিয় করে নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন বিইআরসি চেয়ারম্যান। -আমার দেশ

Translate »