Type to search

Lead Story আন্তর্জাতিক

ইরান যুদ্ধ শেষ করতে হিমশিম খাচ্ছেন ট্রাম্প

ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সর্বশেষ অবস্থান টিকেছিল মাত্র ২৪ ঘণ্টা। বিশ্লেষকদের মতে, এতে স্পষ্ট হচ্ছে, দীর্ঘায়িত এই সংঘাতের ইতি টানতে তিনি এখন ভিন্নধর্মী উপায় খুঁজছেন, তবে এখনো কার্যকর কোনো কৌশল খুঁজে পাননি।

সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ইরানি নৌপরিবহণের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ আবারও কার্যকর করা হচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী সব জাহাজ, এমনকি, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর জাহাজকেও ২০ শতাংশ ফি দিতে হবে। দাবি, বিশ্বের অন্যতম অস্থিতিশীল এই জলপথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের যে ব্যয় হচ্ছে, সেই খরচ মেটাতেই এই অর্থ নেওয়া হবে।

তবে, মাত্র একদিনের ব্যবধানে সেই অবস্থান থেকে পুরোপুরি সরে আসেন ট্রাম্প। নতুন প্রস্তাবে তিনি বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চুক্তি করা হবে। ইঙ্গিত দেন, এসব দেশের জন্য হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌ-যাতায়াত নিশ্চিত করার বিনিময়ে অর্থ আদায়ের বদলে অর্থনৈতিক সহযোগিতার পথেই এগোতে চায় ওয়াশিংটন।

ট্রাম্পের এই আকস্মিক অবস্থান পরিবর্তন এমন এক সময়ে এল, যখন ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত চার মাসের বেশি সময় ধরে চলছে। এক মাস আগে, দুই পক্ষের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছিল। সেটির মাধ্যমে সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয় এবং ভবিষ্যৎ আলোচনার একটি কাঠামো নির্ধারণ করা হয়। তবে বাস্তবে সেই উদ্যোগ সংঘাত থামাতে ব্যর্থ হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ আরও বিস্তৃত করতে ট্রাম্প অনাগ্রহী হওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধটি এখনো জনপ্রিয় নয়। যদি সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে এবং মার্কিন সেনা ও মিত্রদের ওপর আবারও ইরানের হামলার ঝুঁকিও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

অন্যদিকে, কোনো নতুন সমঝোতা ছাড়াই যুদ্ধের ইতি টানাও ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে পারে। কারণ তিনি এমন একটি চুক্তি করতে চান, যেটিকে ২০১৫ সালে বারাক ওবামা প্রশাসনের করা পারমাণবিক চুক্তির চেয়ে ভালো বলে দাবি করা যাবে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ডিফেন্স প্রায়োরিটিজ-এর মধ্যপ্রাচ্য কর্মসূচির পরিচালক রোজমেরি কেলানিড বলেন, সবচেয়ে সম্ভাব্য পরিণতি হলো: এই যুদ্ধের কোনো স্পষ্ট সমাপ্তি নাও হতে পারে। এটি এখন অমীমাংসিত যুদ্ধে পরিণত হয়েছে, আর এ ধরনের যুদ্ধ সাধারণত দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে।

মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় সকাল ১০টা ১৬ মিনিটে ট্রাম্পের সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক ঘোষণার মাধ্যমে কার্যত সমঝোতা স্মারকের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ওই পোস্টে তিনি ইরানি জাহাজ চলাচলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ পুনরায় কার্যকর করার ঘোষণা দেন। একই সময়ে ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় নতুন করে মার্কিন হামলাও শুরু হয়।

এর জবাবে, অঞ্চলজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশ এবং বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা আরও জোরদার করে ইরান। ফলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল আবারও প্রায় অচল হয়ে পড়ে।

প্রায় এক মাস ধরে, দুই দেশের মধ্যে দফায় দফায় আলোচনা চললেও মাঝেমধ্যেই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে, যা তথাকথিত যুদ্ধবিরতির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র আবারও সেই একই সংকটের মুখোমুখি, যা সংঘাতের শুরু থেকেই বিদ্যমান ছিল।

সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের জাহাজ, যুদ্ধবিমান ও বিভিন্ন সামরিক লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস এবং দেশটির প্রতিরক্ষা সক্ষমতা দুর্বল করার মতো কিছু লক্ষ্য অর্জন করেছে। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে সংকটের কোনো স্থায়ী সমাধান এখনো কাগজে-কলমে মেলেনি।

বিশ্লেষকদের মতে, সামরিকভাবে দুর্বল হলেও ইরান এখনো হরমুজ প্রণালিতে নৌ-যাতায়াত বাধাগ্রস্ত করার সক্ষমতা ধরে রেখেছে। আর যুক্তরাষ্ট্র যদি এ অঞ্চলে সামরিক অভিযান নাটকীয়ভাবে আরও বিস্তৃত না করে, তাহলে তেহরানকে সেই পদক্ষেপ থেকে বিরত রাখা তাদের পক্ষে কঠিন হবে।

এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ২০ শতাংশ ফি’কে কেউ কেউ যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের কাছে সামরিক উপস্থিতির ব্যয়কে গ্রহণযোগ্য করে তোলার একটি রাজনৈতিক প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন। যদিও এটি নতুন কোনো ধারণা নয়। যুদ্ধ চলাকালেও একাধিকবার তিনি একই ধরনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন।

তবে মাত্র এক মাস আগে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর ইরানের সম্ভাব্য ফি আরোপের পরিকল্পনার কঠোর সমালোচনা করেছিলেন।

রুবিও বলেছিলেন, ‘আন্তর্জাতিক জলপথে কোনো দেশ টোল বা ফি আরোপ করতে পারে না। আন্তর্জাতিক আইনে এ ধরনের কোনো সুযোগ নেই। বিশ্বের সব আন্তর্জাতিক জলপথেই এই নীতি প্রযোজ্য এবং এখানেও আমরা সেটাই প্রত্যাশা করি।’

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ ইস্যুতে ট্রাম্পের অবস্থান বদল আবারও প্রমাণ করছে যে, যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য তার সামনে এখনো সুস্পষ্ট কোনো ‘পথ নেই’।

এদিকে, সমঝোতা স্মারকটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল, যাতে বহু বিষয় ভবিষ্যৎ আলোচনার জন্য খোলা রাখা হয়। সেখানে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল তদারকির ক্ষেত্রে ইরানের একটি ভূমিকার কথাও উল্লেখ ছিল। নথিতে বলা হয়, ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান সর্বোচ্চ চেষ্টা করে কোনো ধরনের ফি ছাড়াই বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা করবে।’

এই ভূমিকাকে দীর্ঘদিন ধরেই নিজেদের অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে তেহরান। একই সঙ্গে, সমঝোতা স্মারকে ইরানে কয়েকশ’ কোটি ডলারের বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতিও ছিল।

ওয়াশিংটনের ধারণা ছিল, এসব অর্থনৈতিক প্রণোদনা এবং চুক্তি লঙ্ঘনের সম্ভাব্য পরিণতির সতর্কবার্তা মিলিয়ে ইরানকে হরমুজ প্রণালির ভৌগোলিক অবস্থানকে কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা থেকে বিরত রাখা যাবে। তবে আপাতত সেই হিসাব সঠিক প্রমাণিত হচ্ছে না। সূত্র: বিবিসি

Translate »