Type to search

আন্তর্জাতিক

গ্রে-জোন যুদ্ধ

গ্রে-জোন যুদ্ধ হলো শান্তি ও প্রকাশ্য সামরিক সংঘাতের মাঝামাঝি সেই ক্ষেত্র, যেখানে রাষ্ট্রসমূহ তাদের কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনের জন্য জবরদস্তি, প্রতারণা এবং অসামরিক (নন-কাইনেটিক) উপায় ব্যবহার করে। সাইবার আক্রমণ, অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ, সংগঠিত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড এবং প্রক্সি শক্তির ব্যবহার- এসব ধাপে ধাপে প্রয়োগ করা হয়, যাতে সরাসরি সামরিক প্রতিক্রিয়া উসকে না দিয়ে কৌশলগত লক্ষ্য অর্জন করা যায়।

প্রচলিত যুদ্ধের সীমার নিচে থেকে পরিচালিত ধ্বংসাত্মক বা জবরদস্তিমূলক পদক্ষেপ, যা জাতীয় নিরাপত্তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তা ভারতের জন্য একটি দীর্ঘস্থায়ী, বহুমাত্রিক ও তীব্র চ্যালেঞ্জ। ভারতের ভূ-রাজনৈতিক পরিবেশ, বৃহৎ গণতান্ত্রিক কাঠামো, দ্রুত ডিজিটাল অর্থনীতি এবং জটিল ফেডারেল পুলিশিং ব্যবস্থা- সব মিলিয়ে এই ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।
এই চ্যালেঞ্জ এখন বাস্তব। জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় প্রয়োজন অত্যন্ত দক্ষ ও সমন্বিত পদক্ষেপ। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর স্পষ্ট দায়িত্ব নির্ধারণ, বেসামরিক-সামরিক সমন্বয় জোরদার, স্থিতিস্থাপকতা ও উৎস সনাক্তকরণ (অ্যাট্রিবিউশন) সক্ষমতায় বিনিয়োগ, তথ্য ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রক কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো অপরিহার্য।
টার্গেটেড বিভ্রান্তিমূলক তথ্য ও প্রভাব বিস্তারমূলক প্রচারণা, বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে, অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে মেরুকৃত করে, প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা দুর্বল করে এবং কৌশলগত ইস্যু- যেমন জাতপাত, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, সীমান্ত সমস্যা, অবকাঠামো প্রকল্প- এসব বিষয়ে জনমত প্রভাবিত করে।
ভারতের মতো উন্মুক্ত গণমাধ্যম পরিবেশে এ ধরনের হুমকি অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে। প্রতিবেশী দেশগুলোর সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন, বিশেষ করে বাংলাদেশ ও নেপালে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংগঠিত গণমোবিলাইজেশনের মাধ্যমে ঘটেছে, যেখানে জেন-জি প্রজন্মকে লক্ষ্য করে প্রচারণা চালানো হয়।
চীন ও পাকিস্তান নিয়মিতভাবে তথ্যযুদ্ধের অংশ হিসেবে ভুয়া তথ্য প্রচার করেছে, যার লক্ষ্য ভারতে অস্থিরতা সৃষ্টি করা। জ্বালানি, বিদ্যুৎ, পরিবহন, স্বাস্থ্য, আর্থিক খাত ও সরকারি সেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে সাইবার আক্রমণ অর্থনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে, অথচ হামলাকারীর পরিচয় গোপন রাখা যায়।
সাইবার সক্ষমতা তুলনামূলক সস্তা এবং অস্বীকারযোগ্য। ভারতে চীনা সাইবার আক্রমণ নতুন নয়। সম্প্রতি দিল্লির এআইআইএমএস হাসপাতালের সিস্টেম এবং মুম্বইয়ের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটেছে। প্রতিদিন অসংখ্য সাইবার হামলার চেষ্টা প্রতিহত করা হলেও এই খাত ঝুঁকিপূর্ণই রয়ে গেছে।
বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো অর্থায়ন কিংবা বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞাও অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক শুল্কযুদ্ধ (ট্যারিফ ওয়ার) তারই উদাহরণ।
বিদ্রোহী গোষ্ঠী, অপরাধচক্র (চোরাচালান, মাদক, মানবপাচার) এবং সীমান্ত অস্থিরতার মাধ্যমে রাষ্ট্রকে ক্রমাগত ব্যস্ত রাখা যায়। এ ধরনের যুদ্ধ আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, যা দেশের রাজনৈতিক-সামাজিক-অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
মাদক সমস্যা ভারতে গভীর প্রভাব ফেলেছে। কারণ দেশটি ‘গোল্ডেন ক্রিসেন্ট’ এবং ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল’- বিশ্বের বৃহত্তম মাদক উৎপাদন অঞ্চলের মাঝামাঝি অবস্থান করছে। পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে আইএসআই-পৃষ্ঠপোষক মাদক চোরাচালান পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও জম্মু-কাশ্মীরের যুবসমাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। উত্তর-পূর্বে মিয়ানমারভিত্তিক গোষ্ঠীগুলো, চীনের নীরব সমর্থনে, মাদক সরবরাহ করছে।
বিশ্বস্ত তথ্য রয়েছে যে মাদক পাচার থেকে অর্জিত বিপুল অর্থ ভারতে সন্ত্রাসবাদ, বিদ্রোহ ও বামপন্থী উগ্রপন্থা (এলডব্লিউই) অর্থায়নে ব্যবহৃত হচ্ছে। বঙ্গোপসাগর, ভারত মহাসাগর ও আরব সাগর সহ সমুদ্রপথও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, র’, আইবি, এবং রাজ্য পুলিশের মধ্যে সমন্বয় জরুরি হয়ে উঠেছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো গ্রে-জোন প্রভাব মোকাবিলায় সামনের সারিতে থাকে। কিন্তু তাদের কার্যকারিতা নানা কাঠামোগত সমস্যায় সীমাবদ্ধ। আছে প্রযুক্তিগত দক্ষতার ঘাটতি, আইনি প্রমাণের জটিলতা, রাষ্ট্রীয় সম্পৃক্ততা প্রমাণের কঠিন বিষয় এবং গণতান্ত্রিক অধিকারের ভারসাম্য রক্ষা।
এই সীমাবদ্ধতাগুলো দেখায় যে গ্রে-জোন যুদ্ধ মোকাবিলা শুধু পুলিশ বা সেনাবাহিনীর কাজ নয়। প্রয়োজন সমন্বিত, আইনি ভিত্তিসম্পন্ন ও সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য কাঠামো। ভারতের ফেডারেল কাঠামোয় কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে পুলিশিং বিভক্ত। ফলে দ্রুত ও সমন্বিত প্রতিক্রিয়া সবসময় সহজ নয়। তাই ‘হোল-অব-নেশন’ কৌশল গ্রহণ করা উচিত।
এই কৌশলের ভিত্তি হবে সমন্বিত কমান্ড ও সমন্বয় কাঠামো- স্পষ্ট দায়িত্ব, অভিন্ন পরিস্থিতি জ্ঞান এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ। প্রয়োজনীয় আইন সংস্কার, ফরেনসিক ও গোয়েন্দা সক্ষমতা বৃদ্ধি, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষা, সরবরাহ শৃঙ্খল বৈচিত্র্যকরণ এবং সমাজকে বিভ্রান্তিমূলক তথ্যের বিরুদ্ধে সক্ষম করে তোলা।
কূটনৈতিক, আইনি ও আন্তর্জাতিক জোটগত পদক্ষেপ- যেমন তথ্য আদান-প্রদান, যৌথ তদন্ত, নিষেধাজ্ঞা- ব্যবহার করে অস্বীকারযোগ্য জবরদস্তির রাজনৈতিক মূল্য বাড়াতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সুসমন্বিত অসামরিক প্রতিক্রিয়া- নিষেধাজ্ঞা, প্রকাশ্যভাবে দায় নির্ধারণ, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, পাল্টা প্রচারণা, আর্থিক সম্পদ জব্দ করা ইত্যাদি।
গ্রে-জোন যুদ্ধ কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে নিরাপত্তা নীতিতে একটি মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন।

(লেখক অবসরপ্রাপ্ত আইপিএস কর্মকর্তা। তিনি দিল্লি পুলিশ কমিশনার, বিএসএফ মহাপরিচালক, এনসিবি মহাপরিচালক, বিসিএএস মহাপরিচালক এবং সিবিআই বিশেষ পরিচালকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে কর্মরত ছিলেন। অনলাইন দ্য স্টেটসম্যান থেকে তার লেখার অনুবাদ)

Translate »