শ্রীলঙ্কার মাটিতে প্রথম সিরিজ জয়
কলম্বোর মেরিন ড্রাইভ থেকে রানাসিংহে প্রেমাদাসা স্টেডিয়াম সাড়ে ছয় কিলোমিটার দূরে হলেও সমুদ্রের গর্জন শোনা যাচ্ছিল কাচে ঘেরা প্রেসবক্সে বসেও। এই গর্জন মেরিন ড্রাইভে আছড়ে পড়া ভারত মহাসাগরের বিশাল ঢেউ থেকে সৃষ্ট নয়, প্রেমাদাসার জনসমুদ্রের সমর্থনে উৎপত্তি। ‘শ্রীলঙ্কা শ্রীলঙ্কা’ স্লোগানে স্টেডিয়াম মুখর করে রেখেছিলেন তারা। বাংলাদেশের দারুণ বোলিংয়ে নিয়মিত বিরতিতে উইকেট পড়ার পর
ও পাথুম নিশাঙ্কাদের জেগে ওঠার আহ্বান ছিল ৩৫ হাজার দর্শকের স্লোগানে। যদিও টাইগার বোলিং ইউনিট লঙ্কান ব্যাটারদের জেগে ওঠার সুযোগ দেয়নি। তারা টেনেটুনে ১৩২ রান করার পরও সমর্থক হৃদয়ে হয়তো জয়ের স্বপ্ন ছিল। তানজিদ হাসান তামিমরা সে সুযোগ না দিয়ে উত্তাল স্টেডিয়ামে নিস্তব্ধ নামান। সিরিজ নির্ধারণী তৃতীয় ও শেষ টি২০-তে অলআউট ক্রিকেট খেলে ৮ উইকেটে ম্যাচ জেতে বাংলাদেশ। ট্রফি নিয়ে আজই দেশে ফিরছেন লিটনরা।
ক্যান্ডির পাল্লেকেলে স্টেডিয়ামে তিন ম্যাচের সিরিজ হার দিয়ে শুরু করেছিল বাংলাদেশ। ডাম্বুলায় দ্বিতীয় ম্যাচ জিতে সমতায় ফেরে। কলম্বোতে শেষ ম্যাচটি অলিখিত ফাইনালে রূপ নেয়। যেখানে অলআউট ক্রিকেট খেলে ম্যাচ জেতেন লিটনরা। ২-১ ব্যবধানে সিরিজ ও ট্রফি জেতে বাংলাদেশ। শ্রীলঙ্কার মাটিতে এটিই প্রথম কোনো সিরিজ জয় টাইগারদের। লিটনের নেতৃত্বে বিদেশের মাটিতে দ্বিতীয় সিরিজ জয় এটি। গত বছর ডিসেম্বরে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হোয়াইটওয়াশ করেছিলেন তারা। তবে এ বছর আরব আমিরাত ও পাকিস্তানের কাছে সিরিজ হারে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। শ্রীলঙ্কা সফরটি ছিল নিজেদের প্রমাণ করার। সে পরীক্ষায় ভালোভাবেই উতরে গেলেন লিটনরা। নাজমুল হোসেন টেস্ট সিরিজ হেরে দেশে ফিরে গেছেন। মেহেদী হাসান মিরাজ ওয়ানডে সিরিজ জয়ের সুযোগ হাতছাড়া করেছেন শেষ ম্যাচে বাজে খেলে। পিছিয়ে পড়েও লিটন পেলেন ট্রফি।
১৩৩ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে গোল্ডেন ডাক হলেন পারভেজ হোসেন ইমন। থুশারার বলে এলবিডব্লিউ হন তিনি। শুরুর আউটটি ছিল ব্যাটারদের জন্য সতর্কবার্তা। লিটন কুমার দাস ও তানজিদ হাসান তামিম সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে ধরে খেলে ইনিংস গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। যে কারণে দ্বিতীয় উইকেটে ৭৪ রানের জুটি হয়েছে। দুটি চার ও একটি ছয় মেরে ২৬ বলে ৩২ রানে ক্যাচ তুলে আউট হন টাইগার দলপতি। অবশ্য আম্পায়ারের ভুল সিদ্ধান্তে ৮ রানে শেষ হতে পারত তাঁর ইনিংস। রিভিউ নিয়ে বেঁচে গেছেন উইকেটরক্ষক এ ব্যাটার। জুটি ভাঙলেও সেট ব্যাটার তামিম নিজের স্বাভাবিক খেলা খেলে গেছেন। ভ্যান্ডারসিকে প্রথমে ছয়, পরে চার মেরে হাফসেঞ্চুরিতে পৌঁছান তিনি। ক্যারিয়ারের পঞ্চম টি২০ হাফসেঞ্চুরিটি একটি চার ও পাঁচটি ছয় দিয়ে সাজান তিনি। ৪৭ বলে ৭৩ রানে অপরাজিত থাকেন তিনি। টি২০-তে এটিই তাঁর ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ৬৭ রান ছিল আগের সেরা। তাওহিদ হৃদয়ের ব্যাট থেকে এসেছে হার না মানা ২৭ রান।
মেহেদী হাসান মিরাজের জায়গায় শেখ মেহেদিকে নেওয়া টিম ম্যানেজমেন্টের দারুণ এক সিদ্ধান্ত। তিনি বল হাতে একের পর এক ব্রেক থ্রু দেওয়ায় স্বাগতিক শ্রীলঙ্কা টেনেটুনে ১৩২ রানে যেতে পেরেছে। টাইগার এই অফস্পিনার ক্যারিয়ারসেরা বোলিং করে দলকে উজ্জীবিত করেন। ৪ ওভারে ১১ রান দিয়ে ৪ উইকেটে শিকার তাঁর। শেখ মেহেদির আগের সেরা ৪ ওভারে ১৩ রান দিয়ে ৪ উইকেট। ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হোয়াইটওয়াশের সিরিজে মারাত্মক বোলিং করেছিলেন তিনি।
ডাম্বুলার মতো কলম্বোতেও বোলিং ওপেন করেন শরিফুল ইসলাম। তাঁর করা প্রথম বলটিই বাউন্ডারিতে পাঠান লঙ্কান ওপেনার পাথুম নিশাঙ্কা। ৫ বলে ১৪ রান নেওয়ার পর শরিফুলের এলোমেলো হওয়ার কথা। কিন্তু তিনি শেষ বলটা কৌশলে করায় স্কয়ার লেগ দিয়ে চার মারতে গিয়ে তাওহিদ হৃদয়ের হাতে ধরা পড়েন কুশল মেন্ডিস। লঙ্কান দলের সবচেয়ে বড় মাছটি শিকার শরিফুলের বলে। পরের ওভারেও যে ভালো কিছু অপেক্ষা করছে, জানা ছিল না। শেখ মেহেদি পঞ্চম বলে শিকার করেন কুশল পেরেরার উইকেট। উইকেটের ওপর থেকে করা বল ব্যাটে চুমু খেয়ে স্লিপ ফিল্ডার তানজিদ হাসানের হাতে ধরা পড়ে। শরিফুল নিজের দ্বিতীয় ওভারেও উইকেট পেতে পারতেন নিশাঙ্কার ক্যাচ নেওয়া সম্ভব হলে। তানজিম হাসান সাকিব উল্টো দিক থেকে দৌড়ে বল তালুবন্দি করতে পারেননি। ১৪ রানে জীবন পান লঙ্কান ওপেনার; শেষ করেন ৪৬ রানে। শেখ মেহেদি বোল্ড আউট করেন তাঁকে। ক্যাচ ফেলা বোধ হয় ছোঁয়াচে। তা না হলে স্লিপ ফিল্ডার ২ রানে দীনেশ চান্দিমালকে জীবন দিতেন না। যদিও চান্দিমাল ৪ রানে আউট হয়েছেন মেহেদির বলে মিডউইকেট জাকের আলীর হাতে ক্যাচ দিয়ে। মেহেদি তিন ওভার শেষে ১১ রানে ৩ উইকেট নেন। তাঁর চতুর্থ ওভারটি ছিল মেডেনসহ এক উইকেট শিকার। অধিনায়ক চারিথ আসালঙ্কা ফিরতি ক্যাচ দেন তাঁকে।
বাংলাদেশ আঁটসাঁট বোলিং করায় পাওয়ার প্লে থেকে ৩ উইকেট হারিয়ে ৪০ রানে ছিল শ্রীলঙ্কা। ১০ ওভারে করেছে ৪ উইকেটে ৬৬ রান। তানজিম-মুস্তাফিজ-শামীম একটি করে উইকেট নেওয়ায় পরের ১০ ওভারে হাত খুলে খেলতে পারেনি শ্রীলঙ্কা। ফলে শেষের ১০ ওভার থেকেও ৬৬ রান যোগ করতে পেরেছেন তারা। ১৩তম ওভারে তানজিম সাকিব ১৫ আর শেষ ওভারে শরিফুল ২২ রান দেওয়ায় স্কোর ১৩২ রানে নিতে পেরেছে শ্রীলঙ্কা।
-দৈনিক সমকাল

