Type to search

Lead Story আন্তর্জাতিক

ডেমোক্র্যাটদের কবজায় কংগ্রেস

কয়েকদিন আগের কথা। যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচারে জনসভার মাঝে ঘনিষ্ঠ একজনকে একটি প্রশ্ন করেছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিজের কাছে জবাব থাকার পরও তাকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘দলের এতোটা খারাপ অবস্থা’ কিভাবে হলো? জবাবটা পেয়েছিলেন। ইরান যুদ্ধ এবং ফলস্বরূপ জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি। মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফলাফল গতকাল বুধবার প্রকাশিত হওয়ার পর ট্রাম্পকে সেই জবাবটা আরো ভালভাবে দিয়েছেন মার্কিনীরা। তাদের রায়ে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের উভয়কক্ষে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অজর্ন করেছেন। রিপাবলিকানদের ঘাঁটিতে চমক দেখিয়েছেন ডেমোক্র্যাটরা। কংগ্রেস যেন ছেয়ে গেছে নীল হারিয়েছে রিপাবলিকানদের লাল রং। এর মাধ্যমে আগামী দুই বছর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে আইন প্রণয়নের বড় বাধার মুখে পড়তে হবে। ট্রাম্প অবশ্য বলেছেন, ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে কাজ করতে মুখিয়ে আছি।

সিনেটে বড় ধাক্কা রিপাবলিকানদের

আমেরিকার কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেটে মোট আসন ১০০টি। নির্বাচনের আগে সেখানে ৫৩-৪৭ ব্যবধানে এগিয়ে ছিল রিপাবলিকানরা। অর্থাত্, তাদের দখলে ছিল ৫৩টি আসন, ডেমোক্র্যাটদের হাতে ৪৭টি। এ বারের নির্বাচনে ৩৫টি সেনেট আসনে ভোট হয়েছে। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পেতে ডেমোক্র্যাটদের অন্তত চারটি আসন বাড়ানো প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সেখানে তারা সাতটি আসন বাড়িয়েছেন। অর্থাত্ গতকাল বুধবার রাতে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের আসন ৫৪টি। সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে অন্তত ৫১টি আসন প্রয়োজন।

প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণেও ডেমোক্র্যাটরা :সিনেটের পাশাপাশি কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদেও বড় জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাটরা। এই কক্ষে মোট আসন ৪৩৫টি। নির্বাচনের আগে রিপাবলিকানদের হাতে ছিল ২১৮টি আসন। ডেমোক্র্যাটদের আসনসংখ্যা ছিল ২১৪। দুটি আসন ফাঁকা ছিল। প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে অন্তত ২১৮টি আসন প্রয়োজন। গতকাল বুধবার রাতে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সেখানে ডেমোক্র্যাটরা পেয়েছেন ২৩১টি এবং রিপাবলিকানরা পেয়েছেন ১৩৯টি।

রিপাবলিকানদের এলাকায় ডেমোক্র্যাটিক ঢেউ

সিনেটে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা টেক্সাস, ওহাইও এবং কানসাসসহ রিপাবলিকান ঘাঁটিগুলোতে একের পর এক বিজয় তুলে নিয়েছেন। ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যাডাম হ্যামিল্টনকে কানসাসের সিনেট আসনের বিজয়ী হয়েছেন। এই রাজ্যে সর্বশেষ প্রায় ১০০ বছর আগে একজন ডেমোক্র্যাট নির্বাচিত হয়েছিলেন। সাবেক প্যারা অলিম্পিয়ান, ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জশ টুরেক, আইওয়া থেকে পরবর্তী মার্কিন সিনেটর হবেন বলে অনুমান করা হচ্ছে এবং রিপাবলিকান সিনেটর জনি আর্নস্টের নিয়ন্ত্রণে থাকা আসনটি তিনি দখল করবেন। মেইন রাজ্যের সিনেট আসনটি ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ট্রয় জ্যাকসনের কাছে যাবে, যিনি প্রায় ৩০ বছর ধরে আসনটিতে থাকা রিপাবলিকান বর্তমান সিনেটর সুসান কলিন্সের আসনটি দখল করবেন। ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদ রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে অল্প ব্যবধানে হারিয়ে মিশিগান সিনেটে জিতেছেন। এছাড়া ওহাইও রাজ্যের সিনেট আসনটি ডেমোক্র্যাট শেরড ব্রাউনের পক্ষে গেছে এবং টেক্সাসে, ডেমোক্র্যাট জেমস ট্যালারিকো সেনেট আসনটি দখল করেছেন। সাউথ ক্যারোলিননায় ডেমোক্র্যাট অ্যানি অ্যান্ড্রুস রিপাবলিকান প্রার্থী ডারলিন গ্রাহামকে পরাজিত করেন, যিনি প্রয়াত সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের বোন।

যে কারণে বড় হার রিপাবলিকানদের

প্রথমত, মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে দেওয়া সাক্ষাত্কারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, ইরান যুদ্ধ এই নির্বাচনে প্রভাব ফেলেছে। কারণ যুদ্ধের জেরে জ্বালানির বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। পেট্রলের দাম বাড়ায় পরিবহণ খরচ বেড়েছে। বেড়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম, বাড়ি ভাড়া, বিদ্যুত্, স্বাস্থ্য পরিষেবার খরচ। এমনিতেই মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে চাপে ছিল ট্রাম্প প্রশাসন। ইরান যুদ্ধের পরে জ্বালানির খরচবৃদ্ধি সেই পরিস্থিতিকেই আরো জটিল করে তোলে। ফলে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প যে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির কথা ঘোষণা করেছিলেন, তাই ধীরে ধীরে মুখ থুবড়ে পড়ে।

দ্বিতীয়ত, শুল্কনীতি। অর্থনীতিবিদদের একাংশের মতে, দ্বিতীয় দফায় ট্রাম্পের শুল্কনীতিও এই পরাজয়ের জন্য অনেকাংশে দায়ী। বিদেশ থেকে আমদানি করা পণ্যের উপরে বিপুল শুল্ক চাপিয়ে দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করেছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু তাতে দেশের বাজারে আমদানিকৃত পণ্যের দাম এবং শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামালের দাম বেড়ে যায়। ফলে আদতে ক্ষতিগ্রস্ত হন মার্কিনীরাই।

তৃতীয়ত, দুর্নীতি ও ব্যক্তিগত স্বার্থ নিয়ে প্রশ্ন। অনেকের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতি এবং স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগও ভোটে প্রভাব ফেলেছে। ক্রিপ্টোকারেন্সি ও মিম কয়েন সংক্রান্ত ব্যবসায়িক নীতি, পরিবারের সদস্যদের ব্যবসায়িক লেনদেন এবং সরকারি সিদ্ধান্তে প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত স্বার্থ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অনেক অভিযোগেরই হয়তো উত্তর জানা নেই। কিন্তু তা জনগনের মনে প্রভাব ফেলেছে।

চতুর্থত, প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ। ট্রাম্পের দ্বিতীয় দফার শাসনে প্রেসিডেন্টের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, শুল্কনীতি, সরকারি কর্মী ছাঁটাই এবং বিভিন্ন স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংঘাত- সব মিলিয়ে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার পরিধি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। অনেকের অভিযোগ ছিল, রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে থাকা কংগ্রেস প্রেসিডেন্টকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। আমেরিকার সংবিধানে প্রেসিডেন্ট, কংগ্রেস এবং বিচারবিভাগের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ভোটারদের একাংশের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়, রিপাবলিকানদের দখলে কংগ্রেস প্রেসিডেন্টের বিতর্কিত সিদ্ধান্তের বিরোধিতা না করে কার্যত সমর্থনই করে যাচ্ছে।

পঞ্চমত, প্রার্থী বাছাইয়ে ট্রাম্পের ভুল। রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পেছনে ট্রাম্পের প্রার্থী বাছাইয়ের কৌশলও বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। দলেরই একাংশের মতে, দলীয় নেতাদের অভিজ্ঞতার পরিবর্তে আনুগত্যকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন ট্রাম্প। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ টেক্সাস। সেখানে নানা বিতর্কে বিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও কেন প্যাক্সটনকে প্রার্থী করা হলো, তা নিয়ে দলের অন্দরেই প্রশ্নে উঠেছিল। সেই টেক্সাসে শেষমেশ ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জয় পেয়েছেন।

আবার অনেকের মতে, ট্রাম্প সমর্থকদের একাংশ ভোটই দেননি, কারণ এটি ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট পদের নির্বাচন ছিল না। ট্রাম্পও বলেছেন, এই ব্যালটে তিনি থাকলে পরিস্থিতি এমন হতো না। অন্য দিকে, ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার প্রবল আগ্রহ ছিল। ডেমোক্র্যাটরা শুধু নতুন ভোটারদের সমর্থনই পায়নি, নিজেদের পুরোনো ভোটব্যাংককেও ভোটকেন্দ্রে নিতে সক্ষম হয়েছে। এখানেই পিছিয়ে পড়েছেন রিপাবলিকানরা। আর আগামী ২ বছর পিছিয়ে পড়ার খেসারত দিতে হবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তার দল রিপাবলিকান পর্টিকে। এর প্রভাব পড়বে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও।

পররাষ্ট্রনীতিতে প্রভাব ফেলবে?

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যবর্তী নির্বাচনে ধরাশায়ী হওয়ার পরেও ইরান নিয়ে তার অবস্থান পুরোপুরি বদলায়নি। চুক্তি না হলে বড় ধরনের হামলা চালানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। ফলে যুদ্ধের বিস্তার ঘটার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। প্রসঙ্গত, নির্বাচনের দিন প্রকাশিত একাধিক জনমত সমীক্ষায় ইরান যুদ্ধ নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষের ইঙ্গিত মিলেছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের ভোটার সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রায় ৬০ শতাংশ ভোটার মনে করেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া ভুল সিদ্ধান্ত।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের কলামিস্ট নেসরিন মালিকের বিশ্লেষণেও ইরান যুদ্ধকে ট্রাম্পের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে একটি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তার মতে, সংঘাতের অবসান ঘটানো এবং যুদ্ধের ফলে তৈরি হওয়া অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক ক্ষতি সামাল দেওয়া পরবর্তী প্রশাসনের জন্যও সহজ হবে না।

ইউক্রেন, চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক : পররাষ্ট্র নীতি শুধু ইরানেই সীমাবদ্ধ নয়। ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানে রাশিয়ার সঙ্গে সমঝোতার জন্য কিয়েভের উপর চাপ বজায় রাখতে পারেন ট্রাম্প। পাশাপাশি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে সম্পর্কেও নির্বাচনি ধাক্কার প্রভাব পড়তে পারে। আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজের প্রভাব ও দর কষাকষির ক্ষমতা ধরে রাখাই হবে তার সামনে সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ। অভিবাসন নীতি : কংগ্রেসে বিরোধীদের বাধা এড়াতে নির্বাহী আদেশের ওপর আরো বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠতে পারেন ট্রাম্প। অভিবাসন নীতি কড়াকড়ি করতে এমন নির্দেশের পরিকল্পনাই তৈরি করেছে তার প্রশাসন। দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম ১০০ দিনে যেভাবে নির্বাহী আদেশকে ব্যবহার করেছিলেন, সেই পথেই আবার হাঁটতে পারেন তিনি।

জয়ে উচ্ছ্বাসের চেয়েও নজর আগামীর পরিকল্পনায়

ডেমোক্রাটদের জয়কে আগামী দিনের রাজনৈতিক লড়াইয়ের সূচনা হিসেবেই দেখছেন দলের নেতারা। সিনেটে ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমারের বক্তব্য, ‘আমেরিকার মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছেন। এবার সেই প্রত্যাশা পূরণ করার দায়িত্ব দলের।’ তবে ডেমোক্র্যাটদের সামনেও চ্যালেঞ্জ কম নয়। নির্বাচনে জয়লাভের পরে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচ কমানো, স্বাস্থ্য পরিষেবার উন্নতি এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার মতো প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে হবে তাদেরকে। শুধু ট্রাম্পবিরোধিতার ভিত্তিতে পাওয়া জনসমর্থন ধরে রাখা সম্ভব হবে না ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে। ট্রাম্পের মোকাবিলায় বড় ধরনের কৌশলই হতে পারে মূল হাতিয়ার।

Translate »