Type to search

কমিউনিটি জাতীয় বাংলাদেশ

ইউরোপে বাংলাদেশিদের ভাগ্য বদলের স্বপ্ন কতটা কঠিন হলো?

উন্নত জীবনের আশা, ভালো উপার্জন আর সামাজিক নিরাপত্তার টানে ইউরোপ যেতে ইচ্ছুক বাংলাদেশির সংখ্যা নেহাত কম নয়। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাজনীতি ও নীতিতে সাম্প্রতিক পরিবর্তন, সীমান্তে কঠোর নজরদারি এবং ভূরাজনীতি বদলানোর কারণে সেই স্বপ্ন এক জটিল ও কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। স্পেনের সেউতার ঘটনাটি এর সবশেষ উদাহরণ।

সেউতায় অভিবাসী ঢলের ঘটনার ধারাবাহিকতার দিকে তাকালে দেখা যায়, দুটি বিষয় অনেকাংশে ‘পুশ ও পুল ফ্যাক্টর’ হিসেবে কাজ করেছে। পুশ ফ্যাক্টর বলতে, নিজ এলাকা ছাড়তে চাওয়ার নেতিবাচক কারণগুলোকে বোঝায়। স্থানান্তরিত হওয়ার জন্য অন্য অঞ্চলের যেসব বিষয় আকৃষ্ট করে সেগুলোকে পুল ফ্যাক্টর বলে।

বার্তা সংস্থা এএফপি ও মরক্কো ওয়ার্ল্ড নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেউতায় অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ঢল নামার আগের দিন গত বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) ছিল মরক্কোর রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদের সিংহাসন আরোহণ দিবস। এ উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠান ঘিরে নিরাপত্তা কড়াকড়ি চলছিল। সেউতার সীমান্তবর্তী ফনিদেক শহরেও বিপুল সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়। ফলে অনেক অভিবাসনপ্রত্যাশী আতঙ্কে ছিলেন। যা অনেকটা পুশ ফ্যাক্টরের মতো কাজ করেছে।

মরক্কোর ফনিদেক শহরে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ভিড়। ছবি: এএফপিমরক্কোর ফনিদেক শহরে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ভিড়। ছবি: এএফপি

অন্যদিকে চলতি মাসের শুরুতে স্পেনের সর্বোচ্চ আদালত একটি বিশেষ রায় দেন। যেখানে বলা হয়, সেউতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করা অভিবাসীদের আটকের পর মরক্কোয় ফেরত পাঠানো যাবে না। মূলত, এ রায়কে আশ্রয় পাওয়ার সুযোগ হিসেবে দেখে অনেক অভিবাসনপ্রত্যাশী স্পেন অভিমুখে যাত্রা করেন।

কিন্তু এরপরের রাজনৈতিক ও নীতি সংক্রান্ত ঘটনাগুলো ইউরোপে অভিবাসনের বাস্তব চিত্র তুলে ধরছে। যা অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশিদের জন্যেও প্রযোজ্য।

অভিবাসন ঘিরে কী ধরনের রাজনীতি চলছে?
বাংলাদেশ থেকে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ইউরোপে যাওয়ার হার সবচেয়ে বেশি ইতালিতে। দেশটির কট্টর-ডানপন্থী প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি সেউতার ঘটনার পর আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তিনি স্পেনের সঙ্গে শেনজেন চুক্তি স্থগিতের মতো পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছেন।

গত কয়েক বছরে মেলোনির মতো আরও ডানপন্থী রাজনীতিবিদের উত্থান ঘটেছে ইউরোপের দেশগুলোর পার্লামেন্টে। ইউরোপিয়ান পলিসি সেন্টারের (ইপিসি) গত জুন মাসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইইউ-ভুক্ত ২৭টি দেশের মধ্যে তিনটিতে কট্টর-ডানপন্থী এবং ১১টিতে ডানপন্থীরা শাসন করছে। এগুলোর মধ্যে আছে- ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানি, সুইডেন ও বেলজিয়াম।

দুই বছর আগে (২০২৪) ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের পাশাপাশি একাধিক দেশের জাতীয় নির্বাচনে অভিবাসন ইস্যু শীর্ষ এজেন্ডা ছিল। দলগুলো প্রতিটি নীতির ক্ষেত্রে বহিরাগতদের চেয়ে নিজ নাগরিকদের অগ্রাধিকারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তারা অভিবাসনকে শুধু সাংস্কৃতিক ইস্যু হিসেবে রাজনীতিকরণই করেনি, বরং এটিকে অপরাধ, অর্থনীতি, চাকরি, সরকারি সেবা, স্বাস্থ্য ও আবাসনের মতো বিষয়গুলোর সঙ্গে মিলিয়ে ভোট চেয়েছে।

ইউরোপে ডানপন্থীদের উত্থানের চিত্র। ইপিসির সৌজন্যেইউরোপে ডানপন্থীদের উত্থানের চিত্র। ইপিসির সৌজন্যে

নির্বাচনী ওই প্রতিশ্রুতিগুলোর অনেকটাই এখন নীতিতে রূপান্তরিত হয়েছে বা হচ্ছে। যেমন, অভিবাসীদেরকে ইউরোপ থেকে তৃতীয় দেশে সরিয়ে নেওয়া বা ‘প্রত্যাবর্তন কেন্দ্র’ তৈরির একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ডেনিশ রিফিউজি কাউন্সিলের গবেষণা সংস্থা ‘মিক্সড মাইগ্রেশন সেন্টার’ বলছে, ইতালি আলবেনিয়ার সঙ্গে এমন কেন্দ্র তৈরির বিষয়ে চুক্তি করেছে। যুক্তরাজ্য রুয়ান্ডার সঙ্গে একই চুক্তির পরিকল্পনা করলেও পরে তা থেকে সরে যায়।

যুক্তরাজ্যে সবশেষ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আধিপত্য দেখিয়েছে অভিবাসনবিরোধী দল ‘ইউকে রিফর্ম পার্টি’। এই নির্বাচনে লেবার পার্টির ব্যর্থতার দায় নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে সরে গেছেন কিয়ার স্টারমার। নতুন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই স্থানীয় ভোটারদের জন্য আবাসন ও পরিবহন সংক্রান্ত খাতে সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছেন।

অভিবাসন ঠেকাতে অন্য দেশকে ‘নিরাপদ’ ঘোষণার মতো পদক্ষেপও নিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। গত বছরের ডিসেম্বরে বাংলাদেশসহ সাতটি দেশকে নিরাপদ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই পদক্ষেপের কারণে বাংলাদেশ থেকে ইউরোপে গিয়ে আশ্রয় চাওয়ার প্রক্রিয়া আরও কঠিন হয়েছে।

কোন পথে কত বাংলাদেশি ইউরোপে যায়?
জাতিসংঘের অভিবাসন বিষয়ক সংস্থার (আইওএম) গত মার্চ মাসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ২৪ হাজার ৩১৮ জন বাংলাদেশি সমুদ্র ও স্থলপথে ইউরোপে পৌঁছান। যা ২০২৪ সালের নিবন্ধিত সংখ্যার তুলনায় ৫৯ শতাংশ বেশি।

স্পেনের সেউতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করেন দুই অভিবাসনপ্রত্যাশী। ছবি: এএফপিস্পেনের সেউতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করেন দুই অভিবাসনপ্রত্যাশী। ছবি: এএফপি

এই অভিবাসীদের মধ্যে ৮৩ শতাংশ ইতালিতে এবং ১৬ শতাংশ যান গ্রিসে। বাকি প্রায় ১ শতাংশের গন্তব্য ছিল মাল্টা ও স্পেন। আইওএম-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশিরা সবচেয়ে বেশি যে পথ ব্যবহার করে ইউরোপে যান, সেটি হলো মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় (সিএমআর) রুট। এটি উত্তর আফ্রিকার লিবিয়া ও তিউনিশিয়া থেকে থেকে শুরু হয়ে ইতালি বা মাল্টায় গিয়ে শেষ হয়। ২০২০ সালে এ পথ ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১ হাজারের কম থাকলেও গত বছরের দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রান্তিকে তা ৬ হাজার ছাড়ায়। ইইউ কঠোর নজরদারির নীতিমালা প্রণয়নের পর এ সংখ্যা কমছে।

পাঁচ বছর আগে ওয়েস্টার্ন বলকান রুট (ডব্লিউবিআর) বা আলবেনিয়া, বসনিয়া, মন্টিনেগ্রো হয়ে ইউরোপে পৌঁছানোর হার বেশি থাকলেও বর্তমানে নিম্নমুখী। এ রুটেও কঠোর সীমান্ত নজরদারি চলছে। বিপরীতে পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় রুট (ইএমআর) বা তুরস্ক, বুলগেরিয়া, সাইপ্রাস ও গ্রিস হয়ে ইইউতে পৌঁছানোর মাত্রা ২০২৪ সালের পর হঠাৎ বেড়েছে।

আইওএম-এর তথ্য অনুযায়ী, এসব রুট ব্যবহার করে ইউরোপে যাওয়া ব্যক্তিদের ৭৬ শতাংশ ঢাকা বিভাগের বাসিন্দা। এরপরে আছে খুলনা (৬%) এবং চট্টগ্রাম, সিলেট ও রাজশাহীর ৪ শতাংশ।

রুটগুলোতে নতুন কড়াকড়ি
মুয়াম্মার গাদ্দাফির সরকার পতন (২০১১) হলে লিবিয়া ইউরোপগামী অভিবাসীদের জন্য প্রধান ট্রানজিট রুটে পরিণত হয়। ইনফো-মাইগ্রেন্টসের তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি পূর্ব লিবিয়ার বেনগাজি শহরে একটি মেরিটাইম রেসকিউ কো-অর্ডিনেশন সেন্টার (এমআরসিসি) প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনায় সম্মতি দিয়েছে ইইউ। লিবিয়ায় নিযুক্ত ইইউ রাষ্ট্রদূত নিকোলা অরল্যান্ডো গত বৃহস্পতিবার এক বার্তায় এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

অরল্যান্ডো জানান, ইইউর নৌ-অভিযান অপারেশন ইরিনি’র আওতায় বেনগাজিতে সামুদ্রিক উদ্ধার সমন্বয় কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ প্রকল্পে অর্থায়ন করবে ইতালি ও মাল্টা।

সেউতায় যাওয়ার পথে ভাসমান প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে মাদ্রিদ। ছবি: এএফপিসেউতায় যাওয়ার পথে ভাসমান প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে মাদ্রিদ। ছবি: এএফপি

সেউতার ঘটনার পর নতুন করে আলোচনায় আসা পূর্ব আফ্রিকান রুট (মরক্কো ও সাহারা অঞ্চল থেকে স্পেন) দিয়ে কত সংখ্যক বাংলাদেশি ইউরোপে যান সে পরিসংখ্যান জানা যায়নি। গত শুক্রবারের ঘটনার পর এ পথ দিয়ে অভিবাসীদের ঢল ঠেকাতে ভাসমান প্রতিবন্ধকতা স্থাপনের ঘোষণা দিয়েছে মাদ্রিদ।

ধারণা করা হয়, স্পেনে বসবাসরত বাংলাদেশির সংখ্যা প্রায় ৭৫ হাজার। গত এপ্রিলে দেশটির সরকার বাংলাদেশিসহ ৫ লাখ নথিবিহীন অভিবাসীকে বৈধতা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে। অন্তত ১৫ হাজার বাংলাদেশি এই সুবিধার অন্তর্ভুক্ত বলে তখন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ হয়।

স্পেনের দরজাও বন্ধ হবে?

ইউরোপে যখন ডানপন্থীদের উত্থান ঘটছে তখন স্পেনে এখনও ক্ষমতায় আছে সমাজতান্ত্রিক আদর্শের রাজনৈতিক দল। অভিবাসীদের বৈধতা বা নিয়মিতকরণের যুক্তি হিসেবে সরকার বলেছে, প্রবীণ জনগোষ্ঠী বেড়ে যাওয়ায় তাদের শ্রমিক প্রয়োজন। 

দেশটিতে লাতিন আমেরিকা বা আফ্রিকান দেশগুলো থেকে যাওয়া অনেক অভিবাসী কৃষি, পর্যটন ও সেবা খাতসহ গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে কাজ করেন। বাংলাদেশিরাও একাধিক খাতের সঙ্গে যুক্ত। তবে মরক্কো থেকে অভিবাসীদের ঢলের পর সমালোচনার মুখে পড়েছেন প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি অভিযোগ তুলেছেন, অভিবাসীদের নিয়মিতকরণের নীতির মাধ্যমে স্পেন মানবপাচারকে উৎসাহিত করেছে। 

বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, মেলোনি ইইউ রাষ্ট্রপ্রধানদের নিয়ে একটি ঐকমত্য গঠন করেছেন। এর আওতায় ইউরোপে অভিবাসীদের আকর্ষণ করে এমন ‘পুল ফ্যাক্টর’ সংক্রান্ত নীতি বাতিলের দাবি জানানো হয়েছে। এই পুল ফ্যাক্টর হিসেবে তারা স্পেনের নীতির কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। বিপরীতে এমন উদ্যোগের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন সানচেজ। তিনি বলেছেন, ‘সংকটের সময় তারা স্পেনকে নিয়ে রাজনীতি করছে।’ 

সানচেজ প্রায় ৮ বছর ধরে স্পেনের ক্ষমতায় আছেন। অভিবাসনের পক্ষে ও যুদ্ধের বিরোধীতা করায় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে তিনি জনপ্রিয়। তবে জরিপ সংস্থা ইউগভের তথ্য দেখাচ্ছে, দেশের ভেতরে তাঁর জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েছে। গত ২৯ জুনের একটি জরিপে তাঁর পক্ষে সমর্থন দিয়েছেন ৩৩ শতাংশ নাগরিক। বিপরীতে ৬৩ শতাংশ অংশগ্রহণকারী বিরোধীতা করেছেন।    

স্পেনে পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন হওয়ার কথা আগামী বছরের আগস্টে। এর আগে অভিবাসীদের ঢল ও ইউরোপীয় নেতাদের চাপে সানচেজের সরকার নীতি বদল করলে, অনেক অভিবাসনপ্রত্যাশী বিপাকে পড়বেন। ভুক্তভোগী হবেন বাংলাদেশিরাও। -দৈনিক সমকাল

Translate »