বৃষ্টি-বন্যায় বিপর্যস্ত চট্টগ্রাম, খাদ্য-পানির তীব্র সংকট
টানা বৃষ্টি ও বন্যায় চট্টগ্রামের কৃষি খাতে নেমে এসেছে বড় ধরনের বিপর্যয়। আউশ ধান, আমনের বীজতলা ও গ্রীষ্মকালীন সবজির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। মহানগরসহ জেলার ১৬ উপজেলার প্রায় সবকটিই কম-বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ২০ হাজার নলকূপ। ফলে পানি নেমে গেলেও দুর্গত এলাকায় খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এতে হুমকির মুখে পড়েছে জনস্বাস্থ্য।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক হিসাবে, আউশ ধান, আমনের বীজতলা ও গ্রীষ্মকালীন সবজিসহ ১৫ হাজার ৯১১ হেক্টরের বেশি কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৪০০ কোটি টাকারও বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর মধ্যে খাত অনুযায়ী ক্ষতি আউশ ধানে প্রায় ১২০ কোটি টাকা, গ্রীষ্মকালীন সবজিতে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা এবং আমনের বীজতলা ও পুনঃরোপণে ব্যয় ৩০ থেকে ৪০ কোটি টাকা।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন সবজি ও আউশ ধানের চাষিরা। এছাড়া নতুন করে আমনের বীজতলা প্রস্তুত করতে হওয়ায় কৃষকদের উৎপাদন ব্যয়ও বাড়বে। তবে এ হিসাব চূড়ান্ত নয়। নিচু এলাকার অনেক স্থানে এখনো বন্যার পানি রয়ে গেছে। পানি পুরোপুরি নেমে গেলে মাঠ পর্যায়ে পুনরায় জরিপ করে চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতির হিসাব প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অতিবৃষ্টিতে জেলার ৯ হাজার ৪৩ দশমিক ৫ হেক্টর আউশ ধান, ৯৬০ দশমিক ৬৬ হেক্টর আমনের বীজতলা এবং ৫ হাজার ৯০৭ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন সবজি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষিজমির পরিমাণ ১৫ হাজার ৯১১ হেক্টরেরও বেশি।
আউশ ধানের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে বাঁশখালী, সন্দ্বীপ, চন্দনাইশ, ফটিকছড়ি, মিরসরাই ও সাতকানিয়া উপজেলা। এর মধ্যে চন্দনাইশে প্রায় পুরো আউশ আবাদই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাঁশখালীতে ২ হাজার ৩২০ হেক্টর, সন্দ্বীপে ১ হাজার হেক্টর এবং সাতকানিয়ায় ৯২০ হেক্টরের আউশ ধান ক্ষতির তালিকায় রয়েছে।
আমনের বীজতলার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে ফটিকছড়ি, লোহাগাড়া, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও সাতকানিয়ায়। কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, মৌসুমের শুরুতেই বীজতলার এই ক্ষতি ভবিষ্যৎ ধান উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অনেক কৃষককে নতুন করে বীজতলা প্রস্তুত করতে হবে, এতে উৎপাদন ব্যয়ও বাড়বে।
গ্রীষ্মকালীন সবজির ক্ষয়ক্ষতিও উদ্বেগজনক। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে ফটিকছড়ি, বাঁশখালী, সন্দ্বীপ, সাতকানিয়া, চন্দনাইশ ও পটিয়া উপজেলায়। শুধু বাঁশখালীতেই ১ হাজার ২৫০ হেক্টর এবং ফটিকছড়িতে ৯২৪ হেক্টর সবজিক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া সন্দ্বীপে ৬০০ হেক্টর, সাতকানিয়ায় ৭৬১ হেক্টর ও চন্দনাইশে ৮৫০ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন সবজির ক্ষতি হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আপ্রু মারমা বলেন, কদিনের টানা বৃষ্টিতে নিচু এলাকার ফসলি জমিতে পানি জমে থাকায় ধান ও সবজির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। অনেক ক্ষেতেই পানি নামতে দেরি হওয়ায় গাছ পচে গেছে। বিশেষ করে সবজিচাষিরা সবচেয়ে বেশি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
এদিকে সাতকানিয়া, বাঁশখালী ও চন্দনাইশ উপজেলায় ফসলি জমি, রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ির পাশাপাশি বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অন্তত ২০ হাজার নলকূপ এবং ৫ হাজার ৬৯৪টি টয়লেট। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই) জানিয়েছে, তিন উপজেলায় ১২ হাজার ১১০টি নলকূপ সম্পূর্ণ এবং ৭ হাজার ৮৫১টি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব নলকূপের মধ্যে সরকারি ও ব্যক্তিগত উভয় ধরনের নলকূপ রয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্তরা জানিয়েছেন, বন্যার পানি, কাদামাটি জমে যাওয়া এবং পাহাড়ধসের কারণে হাজার হাজার নলকূপ অকেজো হয়ে পড়েছে। ফলে বিশুদ্ধ পানির সংকটে পড়েছে হাজারো মানুষ। একই সঙ্গে এসব উপজেলায় পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিও বেড়েছে।
সাতকানিয়া উপজেলার ১৭ ইউনিয়নে বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে প্রায় ৩ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখানে ৭ হাজার ১২৭ নলকূপ ও ২ হাজার ১৫৬টি টয়লেট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বাঁশখালী উপজেলার ১৪ ইউনিয়নেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সেখানে প্রায় ৩ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি ৮ হাজার ২৬টি নলকূপ ও ২ হাজার ৪২৭টি টয়লেট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপজেলার অনেক এলাকায় নলকূপের মুখ পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় এবং বন্যার কাদা ও দূষিত পানি ঢুকে পড়ায় সেগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে চন্দনাইশ উপজেলার আট ইউনিয়নে প্রায় ২ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখানে ৪ হাজার ৮০৮টি নলকূপ এবং ১ হাজার ৬৬টি টয়লেট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বন্যার পানি নেমে গেলেও অধিকাংশ নলকূপে এখনো ঘোলা ও দুর্গন্ধযুক্ত পানি উঠছে। ফলে অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে দূরদূরান্ত থেকে খাওয়ার পানি সংগ্রহ করছে।
চট্টগ্রামের সাবেক সিভিল সার্জন খুরশিদ জামিল বলেন, বন্যার পর নলকূপের পানি দূষিত হলে ডায়রিয়া, আমাশয়, টাইফয়েড, হেপাটাইটিসসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই ক্ষতিগ্রস্ত নলকূপ জীবাণুমুক্ত করা, প্রয়োজনীয় মেরামত এবং নতুন নলকূপ স্থাপনের পাশাপাশি দুর্গত এলাকায় দ্রুত নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ চন্দ্র দাস জানান, ক্ষয়ক্ষতির তালিকা প্রস্তুত করে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত নলকূপ পুনঃস্থাপন, আংশিক ক্ষতিগ্রস্তগুলো মেরামত এবং দুর্গত মানুষের মধ্যে নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কাজ করছে। -আমার দেশ

