বেসরকারি খাতের সঙ্গে যৌথ ব্যবসায় টিসিবি
নিম্নআয়ের মানুষের কাছে সাশ্রয়ী দামে নিত্যপণ্য পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি)। অথচ টিসিবিই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে ভোজ্যতেল, চিনি ও মসুর ডাল আমদানি করে বাজারদরে বিক্রি করতে চায়। এতে সরকারি সংস্থার মাধ্যমে পণ্য আমদানির সুযোগ তৈরি হলেও নিম্নআয়ের মানুষের বাড়তি সুবিধা নিশ্চিত করার কোনো স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি নেই।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, গরিবের স্বার্থ রক্ষার দায়িত্বে থাকা টিসিবির এ উদ্যোগে জনস্বার্থ কতটা প্রাধান্য পাচ্ছে। আর বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক স্বার্থই বা কতটা সুরক্ষিত হচ্ছে।
যৌথ উদ্যোগে নিত্যপণ্য আমদানির অনুমোদন চেয়ে সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন টিসিবির চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফয়সল আজাদ। প্রস্তাবে এক বা একাধিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগে পণ্য আমদানির কথা বলা হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
টিসিবির এমন প্রস্তাবের কড়া সমালোচনার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের প্রশ্ন- ন্যায্যমূল্যে সাধারণ মানুষের কাছে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার কথা থাকলেও, এখন সরকারি এই প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোগে বেসরকারি ব্যবসার অনুপ্রবেশ ঘটতে যাচ্ছে।
যৌথ আমদানির আড়ালে জনস্বার্থকে পাশ কাটিয়ে বিশেষ মহলের ফায়দা লোটার অভিযোগ ওঠায় পুরো প্রক্রিয়াটির স্বচ্ছতা এবং মুনাফা বণ্টন নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
টিসিবির মূল উদ্দেশ্য হলোÑ বাজারে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং সাধারণ ও নিম্নআয়ের মানুষের নাগালের মধ্যে সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য সরবরাহ করা। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে—টিসিবির পণ্য যদি শেষ পর্যন্ত খোলা বাজারের সাধারণ বা কাছাকাছি দরেই বিক্রি করতে হয়, তবে সরকারি এ উদ্যোগ থেকে নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর বাস্তবে লাভ কী হচ্ছে?
ভর্তুকিমূল্যে পণ্য পাওয়ার কথা থাকলেও সাধারণ মানুষ সেই সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে কি না, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
জানা গেছে, এক বা একাধিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগে পণ্য আমদানির কথা বলা হয়েছে। এতে সরকারি কাঠামোর সুযোগ নিয়ে বেসরকারি কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানকে বাড়তি সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার পথ সুগম করা হচ্ছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানে বেসরকারি ব্যবসার এ অংশীদারত্ব স্বচ্ছতার নীতিকে সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
কীভাবে পণ্য আমদানি হবে, কার কতটুকু বিনিয়োগ থাকবে এবং শেষ পর্যন্ত অর্জিত মুনাফা কীভাবে বা কার পকেটে বণ্টন হবে—তার কোনো স্পষ্ট ও গ্রহণযোগ্য রূপরেখা দৃশ্যমান নয়।
স্বচ্ছতা-জবাবদিহির অভাব
টিসিবির চিঠিতে কোথাও বলা হয়নি যৌথ উদ্যোগের মালিকানা কাঠামো কী হবে, কে কত টাকা বিনিয়োগ করবে। লাভ-লোকসান কী অনুপাতে ভাগ হবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় বেসরকারি অংশীদার নির্বাচন করা হবে এ বিষয়গুলো।
এছাড়া আমদানি খরচ, বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি, ক্রয়মূল্য এবং সম্ভাব্য লোকসানের দায় কার, তারও কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই। এতে আশঙ্কা করা হচ্ছে, ঝুঁকি বহন করবে সরকারি কোষাগার, আর লাভ তুলে নেবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টিসিবিকে একটি কার্যকর জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে টিকিয়ে রাখতে হলে এর কেনাকাটা ও আমদানিসংক্রান্ত প্রতিটি ধাপে শতভাগ স্বচ্ছতা প্রয়োজন। কিন্তু যৌথ আমদানির নামে যদি গোপনীয়তা বা অস্বচ্ছতার আশ্রয় নেওয়া হয়, তবে তা রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহার এবং জনস্বার্থ পরিপন্থী।
জনকল্যাণের নামে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় বেসরকারি বাণিজ্য টিকিয়ে রাখার এই প্রবণতা অবিলম্বে বন্ধ না হলে সাধারণ মানুষের দুর্দশা আরো বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও নীতিনির্ধারকরা এই প্রশ্নবিদ্ধ যৌথ আমদানির বিষয়ে কী ধরনের ব্যাখ্যা বা পদক্ষেপ নেন।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশের এক কোটি নিম্নআয়ের পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর দায়িত্ব টিসিবির, সেই গরিব মানুষের কোনো লাভই এখানে নেই। মাসে প্রায় ৫০ হাজার টন পণ্য বিক্রি করা টিসিবির বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৫ লাখ টন। সেই বাজারের নিয়ন্ত্রণ এখন তুলে দেওয়া হচ্ছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে।
যৌথ আমদানিতে প্রশ্নবিদ্ধ জনস্বার্থের বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিসিবি যদি বাজারদরেই পণ্য বিক্রি করে, তাহলে এই যৌথ উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তাই থাকে না। আন্তর্জাতিক বাজারে সরাসরি কিনতে ব্যর্থ হয়ে এখন মধ্যস্বত্বভোগী তৈরি করা হচ্ছে। এতে পণ্যের দাম কমবে না, বরং বেসরকারি অংশীদারের মুনাফার কারণে সরকারি অর্থের অপচয় হবে।
টিসিবির দাবি, এ উদ্যোগের ফলে দেশে পণ্যের সরবরাহ বাড়বে এবং বাজারদর স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করবে। কিন্তু সরবরাহ বাড়ানোর নামে যৌথ ব্যবসার উদ্যোগ নেওয়া হলেও ভোক্তা পর্যায়ে তার সুফল কীভাবে নিশ্চিত করা হবেÑ সে বিষয়ে প্রস্তাবে স্পষ্ট কোনো নিশ্চয়তা নেই।
বাজারে পণ্যের সরবরাহ বাড়লেই দাম কমবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। ফলে আমদানির পরিমাণ ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম বাড়লেও নিম্নআয়ের মানুষের ব্যয় কমবে কি নাÑ সেটিও অনিশ্চিত।
জনস্বার্থ নিশ্চিতের দাবি
যৌথ উদ্যোগে আমদানির প্রস্তাবটি বর্তমানে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পর্যালোচনায় রয়েছে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা। ফলে প্রস্তাবটি অনুমোদনের আগে জনস্বার্থ সুরক্ষায় কার্যকর শর্ত যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে অংশীদার নির্বাচনে প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া, বিনিয়োগ ও মুনাফা বণ্টনের স্বচ্ছ হিসাব, আমদানি ব্যয়ের নিরীক্ষা এবং ভোক্তাপর্যায়ে বিক্রয়মূল্য নির্ধারণের নীতি প্রকাশ করা প্রয়োজন বলে জানান মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা।
পাশাপাশি যৌথ উদ্যোগে আমদানি করা পণ্যের কত অংশ নিম্নআয়ের মানুষের জন্য বরাদ্দ থাকবে এবং তারা কী দামে পণ্য পাবেন, তা নির্দিষ্ট করা দরকার।
তারা বলেন, টিসিবির কার্যক্রমের সাফল্য শুধু কত টন পণ্য আমদানি হলো বা বাজারে কত পণ্য সরবরাহ করা গেল, তা দিয়ে বিচার করা যায় না। কত মানুষ সাশ্রয়ী দামে পণ্য পেলেন, তাদের ব্যয় কতটা কমল এবং সরকারি অর্থের ব্যবহার কতটা স্বচ্ছ হলো— সেগুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সুতরাং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে শুধু আমদানি বাড়ানোর সম্ভাবনা নয়, নিম্নআয়ের মানুষের স্বার্থ ও সরকারি অর্থের সুরক্ষাকেও অগ্রাধিকার দিতে হবে। অন্যথায় যৌথ উদ্যোগে আমদানি বাড়লেও টিসিবির প্রধান লক্ষ্য—সাধারণ মানুষের কাছে সাশ্রয়ী দামে নিত্যপণ্য পৌঁছে দেওয়া—প্রশ্নের মুখে পড়বে।
এ বিষয়ে কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান আমার দেশকে বলেন, খোদ টিসিবির সক্ষমতা নিয়েই প্রশ্ন রয়েছে। সারা দেশে সংস্থাটির ডিলারদের কার্যক্রম নিয়েও নানা প্রশ্ন ও অভিযোগ রয়েছে। মূলত হতদরিদ্র মানুষের জন্য ভর্তুকিমূল্যে কয়েকটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ করে টিসিবি। এটি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির একটি মডেল। সরকারের কাজ ব্যবসা করা নয়; বরং সাধারণ মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করা।
গত অর্থবছরে টিসিবির পণ্য বিক্রিতে সরকার প্রায় ১,৫০০ থেকে ১,৬০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে। এ অবস্থায় প্রতিষ্ঠানটির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত নিম্নআয়ের মানুষের কাছে সাশ্রয়ী দামে পণ্য পৌঁছে দেওয়া। ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করা নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
টিসিবির মুখপাত্র শাহাদাত হোসেন আমার দেশকে বলেন, এ বিষয়ে একটি প্রস্তাব ইতোমধ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারদের দায়দায়িত্ব এবং মুনাফা বণ্টনের বিষয়গুলো সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) কাঠামোর আওতায় নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। -আমার দেশ

