ফেঁসে যাচ্ছেন চুপ্পু
রাষ্ট্রপতির পদ চলে যাওয়ায় ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার জালিয়াতিতে ফেঁসে যাচ্ছেন সাহাবুদ্দিন চুপ্পু। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার আগের অপরাধে তাকে বিচারের আওতায় আনা হচ্ছে। এক্ষেত্রে বর্তমানে আদালতে চলমান মামলায় তার বিরুদ্ধে দেশত্যাগের নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে।
জানা গেছে, চুপ্পু ছাড়া এ মামলায় অন্য সবার বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে দেশ ছাড়ার নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে আদালত। ওই আদেশ দেওয়ার সময় চুপ্পু রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে থাকায় তার নাম উল্লেখ করা হয়নি। ইসলামী ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এখন চুপ্পু নিষেধাজ্ঞার আওতায় চলে আসবেন।
রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়ার আগে চুপ্পু জেএমসি বিল্ডার্সের প্রতিনিধি হিসেবে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে যুক্ত হন। প্রথমে তিনি ব্যাংকটির পরিচালক ও পরে ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে ইসলামী ব্যাংকের নতুন পর্ষদ শেয়ার জালিয়াতির বিষয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়। ইসলামী ব্যাংকের করা রিটের পর হাইকোর্টের বিচারপতি আশরাফুল কামাল ও বিচারপতি ওয়ালিউল ইসলাম গত বছরের ১১ মার্চ তিনটি নির্দেশনা ও রুল জারি করেন। নির্দেশনা তিনটি ছিলÑ ৫ আগস্টের পর ইসলামী ব্যাংকের বোর্ড ভেঙে দেওয়ার আগের বোর্ড পরিচালকরা ঋণ জালিয়াতিতে জড়িত থাকায় আদালতের অনুমতি ছাড়া বিদেশ যেতে পারবেন না। তাদের ব্যাংক হিসাব জব্দ থাকবে এবং কোম্পানি জেএমসি বিল্ডার্সের কোনো শেয়ার হস্তান্তর করতে পারবে না।
পাশাপাশি বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে (বিএফআইইউ) এ বিষয়ে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশনা দেওয়া হয়। পরে ২০২৫ সালের ২৯ অক্টোবর প্রতিবেদন দাখিল করে বিএফআইইউ। কিন্তু দীর্ঘদিন এ বিষয়ে শুনানি হয়নি। আদালতে জমা দেওয়া বিএফআইইউ-এর তদন্ত প্রতিবেদনে জেএমসি বিল্ডার্সের মাধ্যমে ব্যাংকের শেয়ার নিয়ন্ত্রণ এবং এস আলম গ্রুপের স্বার্থ রক্ষায় চুপ্পুর ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেই প্রতিবেদনের আলোকে করা মামলা দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট।
আইনজীবীরা জানান, শেয়ার জালিয়াতির সময়কালে পরিচালকদের মধ্যে চুপ্পু ছিলেন অন্যতম। ফলে তার ওপরও আদালতের ওই দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা বর্তায়। তবে আদেশ দেওয়ার সময় চুপ্পু রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব থাকায় সরাসরি তার নাম উল্লেখ করে আদালত থেকে আদেশটি আসেনি।
সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, চুপ্পুর ক্ষেত্রে শেয়ার জালিয়াতির যে অভিযোগটি এসেছে, তা সংঘটিত হয়েছে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার আগে। কাজেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার আগের অপরাধ এখন আমলযোগ্য হতে কোনো আইনি বাধা থাকার কথা নয়।
ইসলামী ব্যাংকের লিগ্যাল শাখার দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, উচ্চ আদালতে আবেদন করার সময় তারা চুপ্পুর নাম উল্লেখ করেছিলেন। তবে তিনি রাষ্ট্রপতি থাকার কারণে বিধান অনুযায়ী তার নাম উল্লেখ করেনি আদালত। তবে তারা মনে করেন, যেহেতু ওই সময়কার সব পরিচালককে দেশত্যাগের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে আদালত, তাই পরিচালকের দায়িত্ব পালন করা চুপ্পুও এর বাইরে থাকার কথা নয়।
ইসলামী ব্যাংকের লিগ্যাল শাখার এক কর্মকর্তা গতকাল শনিবার আমার দেশকে বলেন, আদালতের আদেশ জারির সময় ভিন্ন প্রেক্ষাপট ছিল। তিনি তখন দেশের রাষ্ট্রপতি ছিলেন। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে কোনো মামলা আমলযোগ্য নয়। কিন্তু এখন তিনি যেহেতু আর রাষ্ট্রপতি নন, কাজেই এখন বিষয়টি আমলে আসতে কোনো বাধা থাকার কথা নয়। এক্ষেত্রে প্রয়োজন হলে চুপ্পুর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে নতুন করে আবেদন করবেন বলেও জানান তিনি।
সংবিধানে রাষ্ট্রপতির দায়মুক্তি রয়েছে। সংবিধানের ৫১ (২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্রপতির কার্যভারকালে তাহার বিরুদ্ধে কোনো আদালতে কোনো প্রকার ফৌজদারী কার্যধারা দায়ের করা বা চালু রাখা যাইবে না এবং তাহার গ্রেফতার বা কারাবাসের জন্য কোনো আদালত হইতে পরোয়ানা জারি করা যাইবে না।’
বিএফআইইউর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জেএমসি বিল্ডার্সের প্রতিনিধি হিসেবে পরিচালনা পর্ষদে থাকা অবস্থায় চুপ্পু এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা প্রক্রিয়ার অংশ ছিলেন। চারটি স্বাধীন নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনুসন্ধানেও তার সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি উঠে এসেছে। পরে এসব নিরীক্ষা প্রতিবেদন লন্ডনভিত্তিক ফরেনসিক প্রতিষ্ঠান ‘দ্য লয়েড’ যাচাই বা অনুমোদন করেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জানা গেছে, ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তায় দেশের সবচেয়ে বড় শরিয়াহভিত্তিক ইসলামী ব্যাংক দখল নেয় এস আলম গ্রুপ। এই গ্রুপটি কাগুজে (শেল) কোম্পানি খুলে জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যাংক থেকে বিপুল অর্থ তুলে নেয়। সেই অর্থ দিয়ে এস আলম গ্রুপ সংশ্লিষ্ট ২৪টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকের ৮১ দশমিক ৯২ শতাংশ শেয়ার কেনে। শেয়ার কেনা ৭২ দশমিক ০৭ শতাংশ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এস আলম গ্রুপের সম্পর্ক রয়েছে। পরবর্তী সময়ে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করে এস আলম সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
সেই সময় জেএমসি বিল্ডার্সের প্রতিনিধি হিসেবে চুপ্পু ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে পরিচালক হিসেবে যোগ দেন। পরে তিনি ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি ওই পদে ছিলেন।
যেভাবে শেয়ার কেনে জেএমসি বিল্ডার্স
তথ্য অনুযায়ী, জেএমসি বিল্ডার্স শেয়ার কেনার জন্য এস আলম ট্রেডিং কোম্পানি (প্রা.) লিমিটেডের (অ্যাকাউন্ট নম্বর: ০১০২১১১০০০১০৬৭৭, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক) হিসাবের মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তর করেছিল। অর্থাৎ ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার কেনার অর্থ নেওয়া হয় এস আলমের দখল করা ইসলামি ধারার ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক থেকে।
বিএফআইইউর তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ক্যাপিটাল অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডে থাকা অ্যাকাউন্ট নম্বর ০৩৩১ এবং বিও আইডি নম্বর ১৬০৫১৪০০৬২৫৮৫৯৬১-এর মাধ্যমে জেএমসি বিল্ডার্স ইসলামী ব্যাংকের তিন কোটি ২৩ লাখ ৬০ হাজার ৮১২টি শেয়ার কেনে, যা ব্যাংকের মোট শেয়ারের ২ দশমিক ০১ শতাংশ। এসব শেয়ারের মূল্য ছিল ১০২ কোটি ছয় লাখ ৯০ হাজার টাকা। ২০১৭ সালের ২৩ মে এসব শেয়ার কেনা হয়।
অর্থের উৎস হিসেবে বিএফআইইউর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেয়ার কেনার অর্থ সরাসরি জেএমসি বিল্ডার্সের হিসাবে এলেও তার আগে এসব অর্থ একাধিক ধাপে এস আলম গ্রুপ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের হিসাবের মাধ্যমে স্থানান্তর করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, অর্থের প্রবাহ শুরু হয় ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে থাকা এস আলম ট্রেডিং কোম্পানি (প্রা.) লিমিটেডের হিসাব থেকে। পরে তা ইউনিয়ন ব্যাংকের একটি পেমেন্ট অর্ডার হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। এরপর এস আলম ট্রেডিংয়ের ইউনিয়ন ব্যাংকে থাকা একাধিক মুদারাবা টার্ম ডিপোজিট রিসিপ্ট (এমটিডিআর) হিসাব, সানড্রি ক্রেডিটরস হিসাব এবং আবারও এস আলম ট্রেডিংয়ের বিভিন্ন হিসাব হয়ে এসব অর্থ জেএমসি বিল্ডার্সের হিসাবে পৌঁছায়।
তদন্তে আরো বলা হয়, অর্থের প্রাথমিক উৎস হিসেবে জনতা ব্যাংকের মাধ্যমে পরিচালিত গ্লোবাল ট্রেডিং করপোরেশন লিমিটেড এবং এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলস লিমিটেডের পিএডি বিনিয়োগ সুবিধা ও সংশ্লিষ্ট এলসি হিসাব শনাক্ত করা হয়েছে।
বিএফআইইউর ভাষ্য, এই অর্থপ্রবাহের ধারাবাহিকতা শেয়ার কেনায় ব্যবহৃত অর্থের উৎস এবং এস আলম গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আর্থিক সংযোগের ইঙ্গিত দেয়। তদন্ত প্রতিবেদনে অর্থের উৎস শনাক্ত করতে পুরো মানি ট্রেইল উল্টো দিক থেকে অনুসরণ করে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী আরো দেখা যায়, জেএমসি বিল্ডার্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও মনোনীত পরিচালক আহসানুল আলম এস আলমের ছেলে। আরেক পরিচালক জামাল মোস্তফা চৌধুরী এস আলমের ভগ্নিপতি।
মামলা ও বিচারিক প্রক্রিয়া
ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান কর্তৃপক্ষ ২০২৫ সালে সাবেক রাষ্ট্রপতি চুপ্পুসহ ২১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে। মামলায় শেয়ার জালিয়াতি, প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ এবং ব্যাংকের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলাটি বর্তমানে হাইকোর্টে বিচারাধীন।
তদন্ত প্রতিবেদনে যেসব তথ্য ও অভিযোগ উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো এখনো আদালতে প্রমাণ হয়নি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়-দায়িত্ব সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে নির্ধারিত হবে। ফলে তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্যকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।
চুপ্পুর সময়ে ইসলামী ব্যাংক ধস
২০১৭ সালের ৩১ মে ইসলামী ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের সভায় চুপ্পুকে ব্যাংকের স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে নিয়োগের সিদ্ধান্ত বা অনুমোদন দেওয়া হয়, যা পরে ওই বছরের জুনে কার্যকর হয়। এরপর তিনি ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যানের পাশাপাশি অডিট কমিটির সদস্য ছিলেন। এরপর থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ বের করে এস আলম।
দীর্ঘদিনের ঋণ কেলেঙ্কারি, অনিয়ম ও এস আলম গ্রুপের জালিয়াতিতে এক সময়কার সবচেয়ে লাভজনক ব্যাংকটি এখন গভীর সংকটে।
জানা গেছে, ইসলামী ব্যাংক থেকে প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেন এস আলম। তিনি নিজের নামের প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি আত্মীয়স্বজন ও ভুয়া কাগুজে প্রতিষ্ঠান খুলে এসব ঋণ নেন। তবে বিএফআইইউর প্রতিবেদনে এ গ্রুপের নামে-বেনামে এক লাখ পাঁচ হাজার ৪৮৩ কোটি টাকা ঋণের তথ্য উঠে এসেছে।
গত মার্চ শেষে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দাঁড়ায় ৯৫ হাজার ৬২৯ কোটি টাকা বা ৫০ দশমিক ৮৮ শতাংশ। ২০১৭ সালে যেখানে ব্যাংকের খেলাপি ছিল ২৫৩৯ কোটি টাকা বা ৩ দশমিক ৩৭ শতাংশ।
অভিযোগ আছে, এসব ঋণ জালিয়াতি ও অনিয়মের ঘটনা চুপ্পু জেনেও চুপ ছিলেন। অডিট কমিটির সদস্য হিসেবে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা থাকলেও কোনো প্রকার ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি চুপ্পু গত শুক্রবার পদত্যাগ করেন। -আমার দেশ

