৫০০ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রে পদার্পণ করেন মুসলিমরা, জেনে নিন সেই ইতিহাস
আমেরিকা বা যুক্তরাষ্ট্র প্রজাতন্ত্র হিসেবে গড়ে ওঠার অনেক আগেই দেশটির ইতিহাসের অংশ ছিলেন মুসলমানরা। ১৬০৭ সালে ইংরেজদের জেমিটাউন প্রতিষ্ঠা এবং ১৬২০ সালে পিলগ্রিমদের প্লাইমাউথে পৌঁছানোর কয়েক দশক আগেই ১৫২০ ও ১৫৩০-এর দশকে মরক্কোর এস্তেবান দে দোরান্তেস (এস্তেভানিকো নামে পরিচিত) বর্তমান টেক্সাস, নিউ মেক্সিকো ও অ্যারিজোনার মরুভূমিতে পা রেখেছিলেন।
মরক্কোর আটলান্টিক উপকূলের আজেমমুরে জন্মগ্রহণকারী এস্তেভানিকোকে দাস হিসেবে স্পেনে এবং পরে মহাসাগর পাড়ি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়া হয়। এক মর্মান্তিক অভিযানে অধিকাংশ মানুষ মারা গেলেও তিনি বেঁচে যান। তিনি বিভিন্ন নেটিভ আমেরিকান ভাষা শেখেন এবং ভবিষ্যৎ যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চল পাড়ি দেওয়া প্রথম প্রাচীন পৃথিবীর অধিবাসীদের একজন হয়ে ওঠেন। তার মরক্কোয় জন্ম ও জীবনীসংক্রান্ত তথ্যপ্রমাণ নিশ্চিত করে যে তিনি একজন মুসলিম ছিলেন।
অধিকাংশ মুসলিম যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন ক্রীতদাস হিসেবে। তাদের মধ্যে অনেকে ছিলেন পশ্চিম আফ্রিকার সেনেগাম্বিয়ান ও সাহেলিয়ান অঞ্চলের, যেখানে শতাব্দী ধরে ইসলামিক চর্চা বিদ্যমান ছিল।
ধারণামতে, তাদের সংখ্যা ছিল ১০ হাজারেরও বেশি। দাস হিসেবে বন্দি হওয়ার আগেই তাদের অনেকে আরবিতে শিক্ষিত এবং কোরআন ও ইসলামী আইনে দক্ষ ছিলেন। দাসত্ব করা ওমর ইবনে সাইদের আত্মজীবনীর মতো কিছু লিখিত রেকর্ডও রেখে গেছেন তারা।
তাদের গভীর প্রভাব দেখা যায় আমেরিকান সংস্কৃতি ও সংগীতে। গবেষকদের মতে, আমেরিকার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ‘জ্যাজ’ সংগীতের বিকাশে মুসলিম আমেরিকানরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বিশেষ করে শ্যিক্ষেতে কাজ করার সময় দাসদের গাওয়া ‘ফিল্ড হলার’ গান জনপ্রিয় আমেরিকান সংগীতের অন্যতম ভিত্তি ছিল।
অনেক গবেষক এই গানের সুরের মূল খুঁজে পেয়েছেন পশ্চিম আফ্রিকার দাসদের মধ্যে, যারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলা ইসলামি প্রার্থনার ঐতিহ্য ক্ষেতে বয়ে নিয়ে এসেছিলেন। ‘ফিল্ড হলার’, আজান ও কোরআন তিলাওয়াতের সুর ও ভঙ্গির মধ্যে স্পষ্ট মিল পাওয়া যায়। ১৬৪০-এর দশকে মিসিসিপির একটি কাজের গানের সঙ্গে আজানের সুরগত মিলের বিষয়টি ইতিহাসবিদেরা উল্লেখ করেছেন।
পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ধর্মীয় স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও একজন আমেরিকান মুসলিম বড় ভূমিকা রাখেন। ১৯৬৪ সালে হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন ক্যাসিয়াস ক্লে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং নিজের নাম পরিবর্তন করে মুহাম্মদ আলি রাখেন। তিন বছর পর ভিয়েতনাম যুদ্ধে যোগ দিতে বলা হলে তিনি ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে তা প্রত্যাখ্যান করেন।
এর জবাবে তার বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের খেতাব কেড়ে নেওয়া হয়, রিংয়ে নামা নিষিদ্ধ করা হয় এবং পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। টানা তিন বছর (২৫ থেকে ২৮ বছর বয়স পর্যন্ত) এই সেরা বক্সারকে রিংয়ে লড়তে দেওয়া হয়নি।
পরবর্তীকালে তিনি সুপ্রিম কোর্টের শরণাপন্ন হন। ১৯৭১ সালে ‘ক্লে বনাম যুক্তরাষ্ট্র’ মামলায় বিচারকেরা সর্বসম্মতিক্রমে তার সাজা বাতিল করেন। আদালত স্বীকার করে যে, অলির এই সিদ্ধান্ত খাঁটি ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে ছিল। এই রায়ের মাধ্যমে নিশ্চিত হয় যে আমেরিকার সাংবিধানিক ধর্মীয় সুরক্ষা কেবল খ্রিষ্টান বা ইহুদিদের জন্য নয়, বরং সব ধর্মের মানুষের জন্য প্রযোজ্য।
যুক্তরাষ্ট্র গঠনে মুসলমানদের তৃতীয় অবদান হলো তাদের নাগরিক সম্পৃক্ততা ও দানশীলতা। ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের অন্যতম হলো জাকাত, যেখানে নিজের সঞ্চিত সম্পদের ২ দশমিক ৫ শতাংশ দরিদ্রদের দান করার নিয়ম রয়েছে। এর পাশাপাশি রয়েছে স্বেচ্ছায় দান বা সদকা।
ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘মুসলিম ফিলানথ্রপি ইনিশিয়েটিভ’-এর গবেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার মাত্র ১ শতাংশ হলেও ২০২০ সালে আমেরিকান মুসলমানরা দানকার্যে প্রায় ৪৩০ কোটি ডলার (৪.৩ বিলিয়ন) দিয়েছেন। গড়ে প্রতি দাতা দান করেছেন প্রায় ৩ হাজার ২০০ ডলার, যা তাদের অমুসলিম প্রতিবেশীদের (১ হাজার ৯০০ ডলার) চেয়ে অনেক বেশি।
এই অনুদানের প্রায় ৮৫ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই থাকে। এর বড় অংশ মসজিদ বা মুসলিম প্রতিষ্ঠানে না গিয়ে দারিদ্র্যবিমোচন, কোভিড-১৯ মহামারি মোকাবিলা এবং নাগরিক অধিকার রক্ষায় ব্যয় হয়। ২০২১ সালে প্রদত্ত প্রায় ১৮০ কোটি ডলারের জাকাতের বড় একটি অংশ আত্মীয় বা উপাসনালয়ের বদলে দাতব্য অলাভজনক সংস্থায় দেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম বার্ষিকী উদযাপনের এই সময়ে জানা যায়, মুসলমানরা কেবল অতিথি নন, বরং দেশটির ইতিহাস গড়ার অন্যতম অংশীদার ছিলেন।
সূত্র: দ্য কনভারসেশন

